দুর্গার ঘুমটা হঠাৎই ভেঙ্গে গেল ।
খুব বেশীক্ষণ হয়নি শেষ খদ্দের গিয়েছে ।
বাইশ বছরের ক্লান্ত দেহটাকে বিছানায় টেনে সবে মাত্র একটু চোখ বুজেছিল ।
স্বপ্নে তলিয়ে যেতে যেতে দেখল একদল ছোট ছোট মেয়ে স্কুলের মাঠে জমায়েত হয়েছে প্রার্থনা-সঙ্গীতের জন্য – ঠিক যেমনটি সে করত ।
সারাদিন তার ব্যস্ততায় কেটেছে ।
সোনাগাছি-মহল্লার ছেলেমেয়েদের নড়বড়ে রথ তাকে সাজাতে হয়েছিল ।
সব চেয়ে বেশী আবদার ছিল সই পুতুলের পাঁচ বছরের মেয়ে মামনির –
তার প্রিয় মাসীর কাছে ।
শিল্পকলায় দুর্গার একটা সহজাত ক্ষমতা আছে যেটা সে রথযাত্রার মত উপলক্ষ্যে কাজে লাগাতে পেরেছিল ।
বাকী দিনগুলোর আকর্ষণ তেমন নেই তার কাছে ।
জানালার পাল্লা ফাঁক করে দুর্গা বাইরে দেখার চেষ্টা করল ।
পূবের আকাশ সবে ফিকে হতে শুরু করেছে ।
মনে হল অন্ধকারে দুটো ছায়ামূর্তি যেন
উঠোনে ঘোরাফেরা করছে ।
তারা মাটি থেকে কিছু একটা তুলছে ।
দুর্গা হাঁক পাড়তে যাবে, অকস্মাৎ মনে হল গতকাল রথযাত্রা ছিল ।
তবে তো আজ কাঠামো পুজো ।
আজই কুমোরটুলির পটুয়ারা দুর্গা প্রতিমার কাঠামো তৈরী করা শুরু করবে ।
পটুয়াদের মধ্যে এক বহু পুরাতন রীতি আছে – “গণিকা
মৃত্তিকা” । দুর্গা প্রতিমার গঙ্গামাটির সঙ্গে নিষিদ্ধ-পল্লীর মাটিও মেশাতে হবে ।
তা হলই বা গণিকারা সমাজের ব্রাত্য ।
ঈষৎ হেসে দুর্গা জানলা বন্ধ করল ।
বিছানায় ফিরে যেতে যেতে আগের বছরের কথা মনে পড়ল ।
পন্ডিত তারালোচন ভট্টাচার্য্য গঙ্গাস্নান শেষ করে সোনাগাছিতে আসতেন - চারপুরুষের যজমানী ।
পুণ্যমাটির জন্য অনুরোধ করতেন দুর্গা ও অন্য মেয়েদের কাছে ।
প্রথম-প্রথম মেয়েরা পন্ডিতের অনুরোধ রাখত ।
কিন্তু পরের দিকে তারা অভিযোগ জানাতে থাকে ব্যাপারটার ধোঁকাবাজিতে ।
ইদানীং দুর্গা দেখছে পন্ডিত নিজে-নিজেই মাটির যোগাড় করছেন ।
শাস্ত্রীয় মতে মন্ত্রোচারণের সঙ্গে-সঙ্গে, যৌগিক মুদ্রায় আঙ্গুল বেঁকিয়ে মাটি তুলছেন ।
উঠোনের ছায়ামূর্তি দুটো নিশ্চয়ই পটুয়াদের সাগরেদ – ভাবল দুর্গা ।
এই মাটি যোগাড় করার জন্য পটুয়াদের নানা ক্রিয়াকলাপের কথা সে শুনেছে ।
এরা প্রায়শই গণিকাদের ঘুষ দিয়ে থাকে ।
একবার তো একটা ভারী মজার ব্যাপার ঘটে ।
পটুয়াদের মধ্যে একজন বাবু সেজে ঢুকেছিল উঠোনের মাটি নেওয়ার আশায় ।
তারালোচন পন্ডিত প্রথা সম্বন্ধে বলতে গিয়ে বলেছিলেন, “মা দুর্গা যারপর নাই রুষ্ট হবেন যদিনা
তোমাদের শুভেচ্ছা মেলে ।” রুষ্ট দুর্গা উত্তরে বলেছিল “আপনারা বছরে একটা দিনের জন্য আমাদের দেবতা বানাবেন আর বাকী দিনগুলোতে
‘বেশ্যা’ বলবেন – তা হবে
না । আমাদেরও একটা আত্মমর্যাদা
আছে । আমরা চোর-জোচ্চোর নই
। আমরা এখানে নিজের ইচ্ছেতে আসিনি । অভাব আমাদের ঠেলে এনেছে । আমাদের জন্য সমাজ কিছু করুক, তারপর না হয় আমরা মাটি দেব ।”
দুর্গার অভিমানের কারণ আছে ।
সুন্দারবনের বাদা জঙ্গলে দুর্গার জন্ম । বাবা ছিলেন জেলে ।
হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে দশজনের সংসার চালাতেন । তাও তিনি তাঁর আট ছেলেমেয়েকে গ্রামের
পাঠশালায় ভর্তি করেছিলেন । গ্রামেতে দুর্গার নাম ছিল স্বর্ণকণ্ঠী বলে । বেড়ে ওঠার
সঙ্গে সঙ্গে, দুর্গা তার গ্রাম-মাটি-আকাশ নিয়েই গান গাইত ।
একদিন তাদের বাড়ীতে একজন এল, কেমন যেন গ্রামসম্পর্কে জ্ঞাতি
হয় । লোকটি নানা দূরদেশে ঘুরত কাজের জন্য । তারপর আবার সে এল, আরও
বেশ কয়েকবার । অধীর আগ্রহে, ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে, দুর্গা তার কথা শুনত – বড় বড় শহর
ঘোরার গল্প । লোকটার সব কিছু তাকে আকর্ষণ করতে শুরু করল – তার সাইকেল, রেডিও, ঘড়ি,
জামাকাপড় । দুর্গার ক্রমশঃ তাকে পছন্দ হয়ে গেল, যদিও লোকটা তার চেয়ে প্রায় দুগুণ
বড় বয়েসে । কিশোরী দুর্গার গানেও যেন সেই ভালোলাগার ছোঁয়া পড়তে থাকল ।
অবশেষে লোকটি তাকে বিয়ের প্রস্তাব দিল । আরও বলল তাকে সে
একদিন এক নামকরা গায়িকা করে দেবে । দুর্গার গ্রামে তার বয়সী মেয়েদের অনেকেরই বিয়ে
হয়ে গিয়েছে । দীর্ঘকাল ধরে মেয়েদের পড়াশুনো চালাবার ক্ষমতা প্রায় কোন সংসারেরই নেই
। আর মেয়ের বয়স বেড়ে গেলে যে যৌতুকের ভার বাড়বে ।
একদিন ভোরে দুর্গা তার প্রেমিকের হাত ধরে গ্রামছাড়া হল ।
কলকাতাগামী বাসে উঠে সন্ধ্যার মুখে তারা গন্তব্যে পৌঁছল । শহরটার কত গল্প শুনেছে তার প্রেমিকের কাছে ।
তবে চারিদিকের ভীড় আর আওয়াজে প্রত্যন্ত গ্রামের কিশোরী দিশেহারা বোধ করতে লাগল ।
দ্রুত হল তার হৃদস্পন্দন, ভয় হল যদি সে ধরা পড়ে যায় । আবার ভালবাসার মানুষের সঙ্গে
ঘর বাঁধার উত্তেজনাও রয়েছে সেইসঙ্গে ।
তার প্রেমিক এক মধ্যবয়স্কা মহিলার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিল ।
বলল “মাসীর কাছে তোকে ক’টা দিন রাখছি, যতক্ষণ না জানছি তোর মা-বাবা তোকে খোঁজা
বন্ধ করেছে । ভয় নেই, আমি খুব তাড়াতাড়ি চলে আসব ।” দুর্গার মোটেই ব্যাপারটা ভাল লাগল না, কিন্তু সে নিরুপায় ।
সেই রাত্রে, চাঁদের আলোয় দুর্গা দেখল ছোটছোট ফ্রক পরা লাল
লিপস্টিক লাগান মেয়েরা রাস্তার দুধারে দাঁড়িয়ে । একজন একজন করে লোক এসে তাদের
সঙ্গে কথা বলছে, আর মেয়েরা তাদেরকে নিয়ে বাড়ীতে ঢুকছে ।
পরদিন সকালে দুর্গা মাসীকে জিজ্ঞেস করল আগের দিনের রাত্রে
দেখা সেই দৃশ্যর ব্যাপারে । মাসী আবেগহীন গলায় বলল, “তোর মরদে তোকে আমার কাছে বেচে
দিয়ে গেছে রে মেয়ে । এখন থেকে তোকে রোজ রাত্তিরে খাটতে হবে ।” মাসীর নির্দেশে প্রতিরাত্রে চলল দুর্গার
ধর্ষণ । “তুই হলি ফুল । একবার যখন তোকে ছেঁড়া হয়েছে, তখন হাতফেরতা হতেই থাকবি ।”
একমাস বাদে রাস্তায় নামল দুর্গা । খুব তাড়াতাড়িই তার
দশ-বারোজন করে বাবু জুটতে থাকল প্রতিরাত্রে ।
মহামায়া দেবী ও তাঁর বৃন্দাবনধামবাসী আশ্রমিকরা, সর্বমোটে
পঞ্চাশ জন, একত্রিত হয়েছেন । তাঁরা ‘সুলভ ইন্ডিয়া’র প্রতিষ্ঠাতা শ্রীমতী
বিন্দেশ্বরী পাঠকের আমন্ত্রিত । এই প্রতিষ্ঠান কাশী ও বৃন্দাবনে বসবাসকারী
বিধবাদের সেবায় নিয়োজিত । মাসখানেক আগে মহামায়া ও তাঁর সঙ্গিনীরা শ্রীমতী পাঠকের
কাছে কলকাতার দুর্গাপুজোয় অংশগ্রহণের ইচ্ছা প্রকাশ করেন ।
বৃন্দাবনের এই বিধাবারা সবাই পশ্চিমবঙ্গ থেকে আসা । জীবনের
বিভিন্ন সময়ে নিয়তির ফেরে তাঁরা এই আশ্রমে এসে উঠেছেন । অশীতিপর মহায়ার মত সবাই
সমাজের পরিত্যক্তা ।
বিন্দেশ্বরী জানালেন যে তাঁদের প্রতিষ্ঠান মহামায়াদের
অনুরোধ রাখতে চলেছে । পঞ্চাশজন বিধবাকে আকাশপথে কলকাতায় নিয়ে যাওয়া হবে । খবরটা
শুনে মহামায়ার মনে একরাশ আবেগ ভীড় করে এল । শেষ কবে তিনি এরকম আনন্দোৎসবে যোগ দিতে
পেরেছিলেন ? সে প্রায় ষাট দশক আগে । তিনি তখন স্বামীর ঘর করতেন ।
মহামায়ার জন্ম কুমিল্লার এক প্রত্যন্ত গ্রামে, দরিদ্র কৃষক পরিবারে । একচিলতে ক্ষেতের ওপর ভরসা করে তাদের জীবনধারণ । প্রাইমারী স্কুলের পর মহামায়ার আর পড়াশুনো হয়নি । তাঁর পরিবার মনে করতেন যে তাঁর চেয়ে তাঁর ভাইয়েদের পড়াশুনো বেশী
প্রয়োজনীয় । ফলে তাঁকে সূচীশিল্প
ও হস্তশিল্প শৈলী তৈরী করতে মনযোগ দিতে হয় । তাঁর হাতের কাজ গ্রামে জাতিধর্মনির্বিশেষে সমাদৃত হত । সে দেশবিভাগের আগেকার কথা । তখন গ্রামেতে হিন্দু-মুসলমান শান্তিতে একসঙ্গে বাস করত । তারপর এল ১৯৪৬ সালের নোয়াখালির দাঙ্গা ।
সেই কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোর দিনটা মহামায়ার মনে আছে । বোনদের সঙ্গে পুজোর আয়োজনে ব্যস্ত সারাদিন । আঙ্গিনা জুড়ে আলপনা দেওয়া হয়েছে । বাড়ীর ভিতরে পুজোর সাজসরঞ্জাম । দুপুরের দিকে তাঁর বড়দাদা এসে জানালেন গ্রামের মুসলমানরা ওই
অঞ্চলের একমাত্র মসজিদে জমায়েত হয়েছে । তিনি খবরে শুনেছেন
লাগোয়া নোয়াখালি জেলায় নাকি হিন্দু আর শিখরা মিলে মুসলমানদের আক্রমণ করেছে । তারপর যা ঘটল তা বর্ণনাতীত ।
সন্ধ্যের অন্ধকার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দলকে দল মুসলমান বাড়ী
বাড়ী গিয়ে হিন্দুনিধনে মাতল । গ্রামের পথ যা সড়কে গিয়ে পড়ে, তাকে তারা অবরোধ করল
যাতে পালাবার পথ না থাকে । মহামায়াদের বাড়ীর লাগোয়া পুকুর । উপায় না দেখে তাঁর
পরিবার বাড়ীটাকে সুরক্ষার ব্যাবস্থা করল । বাড়ীতে যত আসবাবপত্র ছিল সেগুলো সদর
দরজার সামনে স্তূপীকৃত করা হল । পরিবারের পুরুষরা দরজা আগলালেন, মহিলারা অন্দরে
লুকোলেন ।
আশেপাশের অনেক বাড়ীতে তখন আগুন জ্বলছে । মানুষের আর্তনাদে
আর “আল্লাহ-আকবার” ধ্বনিতে আকাশ বিদীর্ণ হল । অচিরেই মহামায়াদের বাড়ী আক্রান্ত হল
। স্তূপীকৃত আসবাবপত্র আছড়ে পড়ার শব্দে মহামায়া ছোট ভাইবোনদের নিয়ে জানলার ফাঁক
দিয়ে গলে গোয়াল ঘরে আশ্রয় নিলেন । উদ্গত ধোঁয়ায় ঢাকা রক্তিম চাঁদের আলোয়
ভীতসন্ত্রস্ত ভাইবোনরা দেখল একদল আক্রমণকারী তাদের বড়দিদির ওপর বন্য শৃগালের মত
ঝাঁপিয়ে পড়ছে ।
ভোরের আলো ফুটতে আশপাশ আরও বিভীষিকাময় উঠল । বাড়ীর পাশের
ক্ষেতে আবিষ্কৃত হল মহামায়ার বাবার দেহ । বড়দিদির লাশ ভেসে উঠল লাগোয়া পুকুরে,
বড়দাদা হলেন নিখোঁজ । গ্রামের স্কুলের
প্রধান শিক্ষক মোখতা্মার আহমেদ পরিবারটিকে আশ্রয় দিলেন । তাঁর কন্যা রেশমা ও
মহামায়া বিশেষ বন্ধু ।
এক সপ্তাহ পরে, মহামায়ার পরিবার ঢাকা যাওয়া ঠিক করলেন ।
সেখানে তাঁর মামাবাড়ী । তারপর এক শুভদিনে মহামায়া বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হলেন । নব্বধূ তাঁর স্বামীর সঙ্গে ট্রেনে করে রওয়ানা দিলেন
কলকাতা অভিমুখে ।
মহামায়ার শ্বশুরবাড়ী কলকাতার পূর্ব উপকণ্ঠে উদ্বাস্তু কলোনিতে
। আশেপাশে
অনেক ঘর রয়েছে, যারা নোয়াখালির দাঙ্গায় ভিটেমাটিচ্যুত হয়ে ওই কলোনিতে আশ্রয় নিয়েছে
। মহামায়ার
স্বামী আপাততঃ এক পাটকলে শ্রমজীবী । এহেন অবস্থায় মহামায়া পুরোদমে সংসার করায় মেতে
উঠলেন ।
পরবর্তী কয়েক বছরে, কলোনিতে আরও বেশী সংখ্যক উদ্বাস্তু এসে
বাসা বাঁধল । মহামায়ার সংসারও বর্ধমান । একটি ফুটফুটে মেয়ে হয়েছে, নাম মেনকা ।
কলোনির বাসিন্দারা ধীরে ধীরে আবার সংসার পাততে লাগল – নতুন ভাবে, নতুন দেশে ।
একসময় তারা দুর্গাপুজোও শুরু করল । এই সব উৎসবের সময়ে মহামায়ার খুব বেশী করে মনে
পড়ে যায় তাঁর গ্রামের কথা, সেখানের পুজোর কথা । বিবাহইস্তক বাড়ীর সঙ্গে তাঁর আর
দেখাসাক্ষাৎ হয়নি ।
মেনাকার বয়স যখন সবে পাঁচ, পাটকল এক নতুন মালিকাধীন হল ।
মুনাফার লোভে, কর্তৃপক্ষ শ্রমিক ছাঁটাই করা শুরু করল । মহামায়ার স্বামীও পড়লেন সেই
দলে । বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা পাটকলের সদর দরজার বাইরে ধর্মঘটে যোগ দিল । পুলিশ এসে
শান্তিরক্ষার অজুহাতে ধর্মঘটীদের ওপর চালাল গুলি, ঘটনায় মহামায়ার স্বামী নিহত হলেন
।
রাতারাতি মহামায়ার জীবনে আমূল পরিবর্তন ঘটে গেল । স্বামী
ছিলেন সংসারের মুখ্য রুজিরোজগারী । সেখানে মহামায়ার সামান্য পুঁথিগত বিদ্যা ও
সেইসঙ্গে হস্তসূচীশিল্প শৈলী - এই সম্বল করে তাঁদের দুজনের জীবনধারণ করা মুশকিলের হয়ে
উঠল । তাঁর স্বশুরবাড়ী তাঁদেরকে সাহায্য করতে নারাজ । অগত্যা
মেনাকাকে দত্তক দিয়ে মহামায়া বৈধব্যের বেশে বৃন্দাবন অভিমুখে যাত্রা করলেন ।
হঠাৎ করে এক সম্পূর্ণ অপরিচিত পরিবেশে তাঁরই মতন আরও কিছু
মহিলার সঙ্গে বসবাস করাটা মহামায়ার কাছে বেশ কষ্টসাপেক্ষ হয়ে দাঁড়াল । তাঁদের
বরাদ্দ হল মাসিক পাঁচ টাকা – তাই দিয়ে খাদ্য ও জ্বালানির ব্যাবস্থা করতে হবে । ফলে
জীবনধারণ করাটা কঠিন হয়ে উঠল । মহামায়ার জীবন ওই একই খাতে বয়ে চলল পরবর্তী বেশ
কয়েক দশক ধরে । অবশেষে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট ‘সুলভ ইন্ডিয়া’কে নির্দেশ দিল
বৃন্দাবনের এই সমস্ত মহিলাদের দ্বায়িত্ব নিতে । তাঁদের মাসিক ভাতার বৃদ্ধি হল বেশ
অনেকটাই এবং সেই সঙ্গে চিকিৎসার সুযোগও দেওয়া হল ।
দুর্গাপুজো উপলক্ষ্যে কলকাতা যাওয়ার প্রতিশ্রুতি শুনে
মহামায়ার চোখে জল এসে গেল – এমন অনুভুতি বহুদিন বাদে তিনি উপলব্ধি করলেন ।
দুর্গা আজ খুশী,
তার কারণও রয়েছে । এই বছর ‘সোনাগাছি গণিকা সমিতি’ তাদের নিজেদের দুর্গাপুজো
করার জন্য জোর প্রচেষ্টা চালিয়েছিল । বড়তলা থানার কাছে তারা আবেদান রেখেছিল যাতে
অবিনাশ কবিরাজ মিস্ত্রি লেন আর মসজিদবাড়ি রোডের সংযোগস্থলে তাদের পুজোটা করা যায় ।
কিন্তু থানা সে আদেদন নাকচ করে দেয়, যানবাহন চলাচলে বিঘ্ন ঘটবে সেই অজুহাতে ।
অবশেষে সমিতি কলকাতা হাইকোর্টে আপিল করে । কোর্ট তাদের পক্ষে রায় দেয় এবং পুলিশ
কমিশনেরকে শো-কজের নোটিস জারী করে । আজ সেই রায়ের খবর দুর্গাদের কাছে এসে পৌঁছেছে
।
সমাজের পরিত্যক্তা মানুষগুলি এই প্রথমবার বাধানিষেধের বেড়া
ভেঙ্গে নিজেদের প্রয়াসে এতবড়ো একটা অনুষ্ঠান করতে চলেছে । আশেপাশের বারোয়ারী
পুজোগুলোতে অংশগ্রহণ করতে পারা তো দূরের কথা, সামান্য অঞ্জলিটুকু দেওয়ার অধিকার
তাদের ছিল না । এমনকি তাদের ছেলেমেয়েদের গলাধাক্কা জুটত । এখন কোর্টের রায়ের ফলে
তারা নীলমণি রায় স্ট্রিটে একটা ছোট ধাঁচের প্যান্ডেল তৈরী করবে । সমিতির সবাই
জাঁকজমক করে পুজো করার পক্ষে রায় দিল । ঠিক হল অনুষ্ঠানের ষড়োপচার – প্রস্তুতি,
রান্নাবান্না, পুষ্পাঞ্জলি, সিঁদুরখেলা – সবকিছু করা হবে । পুজো কমিটি একটা
যুক্তিসঙ্গত বাজেট তৈরী করল । সমিতির সবাই কিছু-না-কিছু চাঁদা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি
দিল ও সেইসঙ্গে তাদের বাবুদেরও চাঁদা দিতে বাধ্য করল ।
দুর্গা তোড়জোড় করে কাজে নেমে পড়ল, তার ওপর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান
পরিচালনা করার ভার পড়েছে । ছোটদেরকে সে
একত্রিত করল, দলের নাম হল ‘কোমল গন্ধা’ - তারা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করবে
। সমিতির একজন, জাতে ব্রাহ্মণ, পুজো করার দায়িত্ব নিল । দুজন ঢাকির বন্দোবস্ত হল ।
সোনাগাছির পটুয়ারা নামমাত্র খরচে একটা দশহাতি দুর্গাপ্রতিমা করার প্রতিশ্রুতিও দিল ।
প্লেনের ভিতরে ঢুকে মহামায়ার বিস্ময় আর কাটে না । নানা
বাধানিষেধের বেড়া পেরিয়ে তবেই বিধবার দল হাওয়াই জাহাজে পা রাখতে পেরেছে ।
প্রত্যেকেরই এই প্রথম উড়োজাহাজে চড়া, তাই সকলেই কমবেশী উত্তেজিত । এক সুবেশিনী মহিলা
মহামায়াকে সীট-বেল্ট বাঁধতে সাহায্য করল । মহামায়া জানলেন এদেরকে বলা হয় বিমান স্বেচ্ছাসেবিকা
। অবশেষে হাওয়াই জাহাজ মাটির মায়া ত্যাগ করে আকাশে উড়ল ।
বিমান যত উঁচুতে উঠতে থাকল, মহামায়া তত যেন মেঘের কাছাকাছি চলে আসতে থাকলেন । এই সেই মেঘের দল যাদের তিনি অনেক উঁচুতে ভীড় করে
থাকতে দেখেছেন, যারা তাঁর ছোটবেলার আকাশকে সূর্যাস্তের রঙে ভরিয়ে রাখত, বাদলার
দিনগুলোকে সজল করে তুলত – আজ তারা নাগালের মধ্যে ! আর তাঁর এত পরিচিত মাটি কেমন
অনেক দূরে সরে গিয়েছে ।
একঘন্টা বাদে বিমান কলকাতার বুকে অবতরণ করল ।
পৌঁছনোর সঙ্গে সঙ্গে অভ্যর্থনা কমিটি মহামায়াদের এক মঞ্চে
এনে হাজির করল । ঢাকের তালে তালে অতিথিদের বরণ করা হল । পরবর্তী কটা দিন আরও
অন্যান্য পূজামণ্ডপে তাঁদেরকে অভ্যর্থনা জানান হল । দু’এক জায়গায় তাঁরা প্রদীপও
জ্বালিয়ে অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করলেন । এক মণ্ডপ তো আবার বৃন্দাবনের শ্রীকৃষ্ণ
মন্দিরের আকারে তৈরী ।
এত অল্পসময়ের মধ্যে এত পরিচর্যা - মহামায়ার কেমন যেন ঘোরের
মধ্যে কাটতে লাগল । আশ্রমের একাকী জীবনে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন, এ যেন সম্পূর্ণ তার
বিপরীত পরিস্থিতি । সামাজিক নিয়মে বিধবাদের সংসর্গ ত্যাগ করা উচিৎ , শুধু তাইই নয়
তাদের ছায়া স্পর্শ করাও পাপ । সেখানে পদে পদে আপ্যায়ান - মহামায়া হিসাব মিলাতে
পারেন না । তবু তারই মধ্যে তাঁর দৃষ্টি বার বার খোঁজে সেই জীবনটাকে – যা ছিল তাঁর মেনকাকে ঘিরে – যেটাকে তিনি ছেড়ে
গিয়েছেন বহুদিন আগে ।
অষ্টমীর রাতে মহামায়া ও তাঁর সাথীরা বার হলেন উত্তর কলকাতার
পথে । বিভিন্ন পুজো কমিটির সঙ্গে বন্দোবস্ত হয়েছে যাতে এই মহিলারা ভীড় এড়িয়ে
প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে ঘুরে প্রতিমা দর্শন করতে পারেন । রবীন্দ্র কাননের পালা শেষ
করে তাঁরা যতীন্দ্র মোহন অ্যাভিনিউর দিকে হাঁটতে থাকলেন । সেখান থেকে গাড়ি তাঁদেরকে
নিয়ে যাবে পরবর্তী গন্তব্যস্থলে – বাগবাজার পল্লীর পুজোয় ।
নীলমণি মিত্র স্ট্রীট পার হতে গিয়ে মহামায়ার কানে ভেসে এল
মাইকে গাওয়া এক পরিচিত গানের সুর । কোনো একটি ছোট মেয়ে আধো আধো সুরে কবিগুরু
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গান গাইছে । সঙ্গীসাথীদের ছেড়ে মহামায়া সেই গানের উৎসের দিকে
এগোতে থাকলেন । দেখলেন মঞ্চের ওপর দাঁড়িয়ে একটি বছর পাঁচেকের মেয়ে, পরণে তার শাড়ী
যা কিনা তার ছোট্ট অবয়বকে বিশালাকারে ঘিরে রয়েছে । শ্রোতাদের ভীড়ে দাঁড়িয়ে মহামায়া
মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন সেই দিকে – এ যেন তাঁর মেনকা । এই শহরের বুকে তাঁদের
দুজনের শেষ দুর্গাপুজোয় এই গানই তিনি শিখিয়ে ছিলেন তাঁর মেনকাকে ।
এইভাবে মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে মহামায়া কতক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলেন খেয়াল
নেই, সম্বিৎ ফিরল “দিদিমা” ডাকে । একটি সুন্দরী যুবতী তাঁকে ধরে রয়েছে মঞ্চের
একেবারে ধার ঘেঁসে । “দিদিমা তুমি বসবে,” মেয়েটি মহামায়াকে জিজ্ঞাসা করল । মহামায়া
ঘাড় নাড়লেন, পরিবর্তে জল চাইলেন । এতটা পথ হেঁটে এসে তাঁর গলা শুকিয়ে উঠেছে ।
মেয়েটি কোথা থেকে মহামায়াকে এক গ্লাস জল এনে দিল । “আমি
দুর্গা,” মেয়েটি সপ্রতিভভাবে উত্তর দিল । তার পরেই এক নাগাড়ে বলে যেতে থাকল কেমন
করে মামণি আর অন্য বাচ্ছাদের সে তৈরী করেছে আজকের এই অনুষ্ঠানের জন্য । এখনকার এই
আনন্দ সত্যিই অপূরণীয় । “আমাদের কাছে এ পুজো করাটা অসাধ্যসাধন, আর পাঁচজনের মত
আমরাও যে মানুষ সেটা আমরা অবশেষে প্রমাণ করতে পারলাম,” দুর্গার গলায় চাপা অহঙ্কার
।
মহামায়া জানতে চাইলেন মামণির সঙ্গে দেখা করা যাবে কিনা ।
দুর্গা ইশারা করল তার পিছুপিছু আসতে । দুজনে প্যান্ডেলের
ভিতরে ঢুকে দেখেন মামণি তার মায়ের কোলে । পুজোর প্রসাদ থেকে নকুলদানা বেছে বেছে হাতের
মুঠোয় বন্দী করেছে । মায়ের সঙ্গে গলা তুলেই কথা বলছিল মামণি – মঞ্চে উঠে তার প্রথম
প্রথম ভয় করছিল, কিন্তু পরে নাকি তা ঠিক হয়ে যায় । অকস্মাৎ মাসীর সঙ্গে এক অপরিচিত
মুখ দেখে তার কথার ফল্গুধারা যেন শুকিয়ে গেল । পুতুলের সঙ্গে মহামায়ার পরিচয় করিয়ে
দিল দুর্গা । মাকে আরো জোরে আঁকড়ে ধরে ফাঁকফোকর দিয়ে মহামায়াকে দেখার চেষ্টা করলো
মামণি । মহামায়া হাত বাড়িয়ে তার চুলে আলতো করে বিলি কেটে দিলেন । লজ্জায় মামণি মার
কাঁধে মুখ লুকলো, সেই দেখে মহামায়ার মুখ হাসিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠল ।
মাতৃরূপিণী দুর্গার দৃষ্টিতলে সমাজের ব্রাত্যজনেরা এক হয়েছে
যেন বারোয়ারী পুজোর স্বার্থকতা জাহির করতে ।
বাইরে মাইকে কেউ ঘোষণা করল, “মহামায়া দেবী, আপনি যেখানেই
থাকুন, দয়া করে মঞ্চের পাশে চলে আসুন, আপনার সাথীরা অপেক্ষা করছেন ।”
প্রিন্সটন, নিউ জার্সি
২রা ফেব্রুয়ারী, ২০১৭



No comments:
Post a Comment