Friday, May 8, 2020

আলোয় ফেরা


প্রতি বছর সময়ের কাঁটা মিলিয়ে এই বৈশাখ মাসে আমার নিউ জার্সির ঘর-গেরস্থালির আশপাশ ঘিরে প্রকৃতি অপরূপ সাজে সেজে ওঠে । কোথায় “দারুণ অগ্নিবাণেরে, হৃদয় তৃষায় হানেরে...” মতন পরিস্থিতি হবে তা নয়, এ যেন “মনে মনে রচি মম ফাল্গুনী”র এক নিরবিচ্ছিন্ন অবকাশ । পৃথিবীর অন্যপ্রান্তে, শহর কলকাতায়, ঠিক একই সময়ে পিচ-গলানো আগুনের হল্কা ছুটছে, ফাঁকে-ফাঁকে হয়ত চলছে কালবৈশাখীর আনাগোণা । নববর্ষ দিয়ে যে মাসের প্রারম্ভ, অচিরেই তা পঁচিশে এসে পৌঁছয় । আর প্রতি বছরের মতই এক অন্তর্যাত্রার পথে পা বাড়াই । কবে কোথায় শুরু এই নিয়ম করে বেনিয়মী পথচলা তা সঠিক মনে নেই ।
শৈশব-কৈশোরের দিনগুলোর অনেকটাই ভরে থাকত রবীন্দ্রচর্চায় – মধ্যবিত্ত বাঙ্গালী পরিবারে বইয়ের আলমারীতে সযত্নে রক্ষিত রবীন্দ্র-রচনাবলীর পাতা ওলটানো থেকে আকাশবাণী হতে সম্প্রচারিত রবীন্দ্রসঙ্গীত শোনা – যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে উত্তরোত্তর বেড়েছিল । স্কুলের অনুষ্ঠান থেকে পূজো প্যাণ্ডেলের অনুষ্ঠান – সুযোগ পেলেই “বহু যুগের ওপার হতে” কবিতা, গান, নাটক ভেসে আসত এক কিশোরের রোমান্টিকতাকে ভরিয়ে তুলতে । আরও একটু বয়সকালে, পঁচিশে বৈশাখ মানেই ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে রবীন্দ্রসদন অভিমুখে যাত্রা করা
রবীন্দ্রয়াণের ফলস্বরুপ শিখলাম অনেক কিছুই – এমন কিছু যা সেই মহান চিন্তাধারার সঙ্গে নিবিড় পরিচয় করিয়ে দেয় । তবে সেই চেনাটা রয়ে গেল যা কিছু নিয়মানুসারে গঠিত – কবিতা, গান, স্বরলিপি, গল্প-উপন্যাস, গীতিনাট্য, ইত্যাদি – সেই সবের মধ্যে । অথচ এই কাঠামো তো তাঁরই তৈরী, পাছে ভবিষ্যকাল তাঁর এই সৃষ্টিসম্ভারকে ভুল ব্যাখা করে । বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মনের মধ্যে একটা কৌতূহল থেকেই গেল – সেই মহান চিন্তাধারার উৎস কি বা কোথায় ?
ব্যক্তিত্বের পরিচয় পাওয়া মানেই যে ব্যক্তির সঙ্গে পরিচয় তা তো নয় । এই উপলব্ধিটা প্রাসঙ্গিক হল আরও অনেকগুলো বছর পরে । একবিংশ শতাব্দীর প্রায় গোড়ার দিকে, নিউ জার্সির কিছু নাট্যমনস্ক মানুষ বন্ধুবর গৌতম দত্তের উৎসাহে স্থির করলেন প্রখ্যাত সাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কালজয়ী উপন্যাস “প্রথম আলো” মঞ্চস্থ করবেন । গৌতম খসড়া করলেন নাটকের পাণ্ডুলিপি । নাটকের বাড়তি আকর্ষণ হল সুনীলদা ও তাঁর স্ত্রী স্বাতী গঙ্গোপাধ্যায়কে যথাক্রমে রাজা বীরচন্দ্রমাণিক্য ও রাণী ভানুমতীর ভূমিকায় পাওয়া ।  নিউ জার্সি ছাড়াও অন্যান্য কয়েকটি রাজ্যে নাটকটি মঞ্চস্থ করার ব্যবস্থা গৌতম করে ফেললেন । নাটকের বেশ কিছু চরিত্রের জন্য অভিনেতা-অভিনেত্রী বাছাই করা হয়ে গেলেও একটি বিশেষ চরিত্র তখনও ফাঁকা পড়ে – রবীন্দ্রনাথ ।
যতদূর জানতাম ওর আগে রবীন্দ্রনাথকে মঞ্চে বা রূপালী পর্দায় কখনও চরিত্রায়ণ করা হয়নি । তাই পরিচালক গৌতম বা অন্যদের কাছে কোন উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত ছিল না যে ঠিক কি ভাবে তাঁর চরিত্রকে মঞ্চস্থ করা যেতে পারে এবং সে দায়িত্ব কার ওপর ন্যস্ত হবে । নাটকের পাণ্ডুলিপি অনুসারে চরিত্রের মুখে সংলাপ ছাড়াও থাকবে কবিতা ও গান । চরিত্রায়ণের সব থেকে কঠিন দিক হল বয়ঃসীমা – রবীন্দ্রনাথের ঠারো থেকে বিয়াল্লিশ বছর উপস্থাপিত হবে এই নাটকে । প্রথমে ঠিক করা হল পাণ্ডুলিপিতে কিছু রদবদল ঘটিয়ে দু’জনকে দিয়ে নাটকের দুই অঙ্কে অভিনয় করানো হবে । অডিশনে সেইমত ব্যবস্থা নেওয়া হল, এবং সেখানে আমিও ছিলাম । ক’দিন বাদে গৌতমের ফোন এল – সুনীলদা এবং অন্যান্যদের সঙ্গে আলোচনা করে উনি এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে রবীন্দ্রনাথের ভূমিকায় একজনই অভিনয় করবেন এবং সে দায়িত্ব আমাকেই দেওয়া হচ্ছে ।
অভিনয়ের অভিজ্ঞতা থাকলেও ঐতিহাসিক বা এই ধরণের বিশেষ চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ আগে কখনও আসেনি । আর রবীন্দ্রনাথ তো বিশেষের মধ্যেও বিশিষ্ট । প্রায় প্রতিটি বাঙ্গালীর মানসে তাঁর এক স্বকীয় স্থান, আমিও তার ব্যতিক্রম নই । সেই অতিসম্ভ্রমের জায়গা থেকে চরিত্রটিকে বাস্তব করে তোলা যে সহজ হবে না তার আভাস দিলাম গৌতমকে । তবে আমি আমার যথাসাধ্য চেষ্টা যে করব সে প্রতিশ্রুতিও দিলাম ।
রবীন্দ্রনাথের বিস্তৃত রচনাসম্ভার, সাদাকালো ছবি আর চলচ্চিত্রে পরিণত বয়সের আবছায়া মূর্তি – এই হল চরিত্রায়ণের পুঁজি । বলা বাহুল্য চল্লিশোর্ধে অতি-পরিণত অভিনেতার পক্ষে আঠারোর তারুণ্যকে বাস্তবায়িত করা কষ্টকর, সেখানে তো আমি নিতান্তই অপটু । সব থেকে দুরূহ হয়ে দাঁড়াল সেই দৃশ্য যেখানে বিংশবর্ষীয় কবি রচনা করছেন “নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ” সেই মুহূর্তে আমার সীমাবদ্ধ সৃজনশীলতা এক অন্তরায় হয়ে উঠল
মানুষ মাত্রেই প্রকৃতির নিবিড় সান্নিধ্য উপভোগ করে । রবীন্দ্রনাথের ক্ষেত্রে এই সম্পর্ক এক বিশেষ মাত্রা নিয়েছে । প্রকৃতির নানা রূপ-রস-গন্ধ-বর্ণ তাঁর অন্তরকে এক মহাজাগতিক অনুভূতিতে ভরিয়ে তোলে । যখন অন্তরাত্মার এই অনুভূতি তাঁর আত্মাকে স্পর্শ করে, তখন এক গভীর অস্থিরতায় তাঁর আত্মা ভরে ওঠে ।  ফল্গুধারার মতো বহতা অশান্ত চিত্ত বহির্জগতে তার মুক্তি খোঁজে – স্বপ্নভঙ্গ হয়ে নির্ঝরের জাগরণ – দৃশ্যটির ক্রিয়া-কেন্দ্র এইটাই ।
“প্রথম আলো” নাটকের একটি দৃশ্য – কাদম্বরী ও রবীন্দ্রনাথ
হু প্রচেষ্টার ফলস্বরুপ ব্যর্থতা ছাড়া আর কিছু এলো না । এদিকে নাটক মঞ্চস্থ করার দিনও এগিয়ে আসছে । অবশেষে স্থির করলাম যে পাণ্ডুলিপির বাইরে চরিত্র আর অভিনেতার মধ্যে এক মেলবন্ধনের বিশেষ প্রয়োজন । কবির অন্তরে যে বহির্জগতের সঙ্গে এক “নিগূঢ় আত্মীয়তা” ঘটেছে, অভিনেতাকেও সেইরকম অন্তর্যাত্রায় গিয়ে মহাজগতের সঙ্গে আত্মীয়তা গড়ে তুলতে হবে ।  “নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ” কবিতার টীকা, ওই বিশেষ ক্ষণের পর্যালোচনা রবীন্দ্রনাথের নিজের কলমে, এবং সুনীলদার বিষয়টি নিয়ে অভিমত – কোন কিছুই বাদ দিলাম না ।
একটি তাৎপর্যপূর্ণ দিনে, অপরাহ্ণ ও বিকেল মিলিয়ে “নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ” রচনা করা হয় । এই সৃষ্টিকে কবি যে আখ্যা দিয়েছেন “আমার সমস্ত কাব্যের ভূমিকা” বলে তার কারণ শুধুমাত্র এর স্বকীয়তাই নয়, এর উৎসের প্রতিভাসটিও কম তাৎপর্যপূর্ণ নয় । এ বিষয়ে “জীবনস্মৃতি”তে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন –
“সদর স্ট্রীটের রাস্তাটা যেখানে গিয়া শেষ হইয়াছে সেইখানে বোধকরি ফ্রি-স্কুলের বাগানের গাছ দেখা যায় । একদিন সকালে বারান্দায় দাঁড়াইয়া আমি সেইদিকে চাহিলাম । তখন সেই গাছগুলির পল্লবান্তরাল হইতে সূর্যোদয় হইতেছিল । চাহিয়া থাকিতে থাকিতে হঠাৎ এক মুহূর্তের মধ্যে আমার চোখের উপর হইতে যেন একটা পর্দা সরিয়া গেল । দেখিলাম, একটি অপরূপ মহিমায় বিশ্বসংসার সমাচ্ছন্ন, আনন্দে এবং সৌন্দর্যে সর্বত্রই তরঙ্গিত । আমার হৃদয়ে স্তরে স্তরে যে-একটা বিষাদের আচ্ছাদন ছিল তাহা এক নিমেষেই ভেদ করিয়া আমার সমস্ত ভিতরটাতে বিশ্বের আলোক একেবারে বিচ্ছুরিত হইয়া পড়িল । সেইদিনই ‘নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ’ কবিতাটি নির্ঝরের মতোই যেন উৎসারিত হইয়া বহিয়া চলিল ।”
তিনি আরও লিখেছেন – “লেখা শেষ হইয়া গেল, কিন্তু জগতের সেই আনন্দরূপের উপর যবনিকা পড়িয়া গেল না । এমনি হইল আমার কাছে তখন কেহই এবং কিছুই অপ্রিয় রহিল না ।” রবীন্দ্রনাথের শৈশব-কৈশোর-যৌবনে নানা উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটেছে । কিন্তু এই বিশেষ অনুভুতির কথা রবীন্দ্রনাথ বহুবার, নানা পরিস্থিতিতে বলে গিয়েছেন পরবর্তী জীবনে ।
দৃশ্যটিতে রবীন্দ্রনাথ ছাড়াও রয়েছেন কাদম্বরী, কবির “নতুন বৌঠান” । দশ নম্বর সদর স্ট্রীটের বাড়ীতে কবি তখন রয়েছেন তাঁর প্রিয় জ্যোতিদাদা ও নতুন বৌঠানের সঙ্গে । কাদম্বরী ও রবীন্দ্রনাথ, দু’জনাই সেইসময় সাময়িক অসুস্থতা কাটিয়ে উঠছেন । সুতরাং দৃশ্যটিতে তাঁরা একপ্রকার “নবজীবন” লাভ করছেন ওই কবিতা সৃষ্টির মুহূর্তটিতে । ওই সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের চরিত্রটি এক ঘোরের মধ্যে পড়ে প্রায় বিকারগ্রস্ত অবস্থায় “আচ্ছাদন ভেদ” করার চেষ্টা করছে, যে রবীন্দ্রনাথ বারংবার এইভাবে প্রাত্যহিকতার বেড়াজাল সরিয়ে অনিত্যকে খুঁজেছেন । সেই অনিত্যের ছোঁয়া পাওয়ামাত্র চরিত্রটি এক অনীর্বচনীয় আনন্দে ভরে ওঠে এবং সেই মুহূর্তে উৎসারিত হয় সমস্ত ভাব ও শব্দ যা দিয়ে গাঁথা হ “নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ”।
নাটকের প্রদর্শনীতে এই দৃশ্যটি দর্শকদের মনে বিশেষ দাগ কাটে । গভীর আবেগ ও নাটকীয়তার মাঝামাঝি একটা সূক্ষ রেখা ধরে এর উপস্থাপনা সহজসাধ্য ছিল না । অভিনয়ের সামান্য তারতম্যে দৃশ্যটিতে অতিনাটকীয়তা ঘটে যাওয়ার সুযোগ ছিল যথেষ্টই । নাটকের প্রদর্শনীর ফাঁকে সুনীলদার অভিমত জানতে চাই – ওনার কল্পনার রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে উপস্থাপিত চরিত্রটির কতখানি সাযুজ্য রয়েছে, চরিত্রায়ণ বাস্তব হয়েছে কিনা, ইত্যাদি । তাঁর মতে, যেখানে আমরা প্রত্যেকে রবীন্দ্রনাথকে “আপন মনের মাধুরী মিশায়ে” রচনা করে চলেছি, সেখানে যে এক এক জন তাঁকে এক এক ভাবে উপস্থাপন করবে, সেটাই স্বাভাবিক ।
“প্রথম আলো” মঞ্চায়ণ হয়েছিল প্রায় দু’দশক আগে । আজও পঁচিশে বৈশাখে ভাবতে বিস্মিত হই, সেই কোন যুগের প্রভাতে এক তরুণের “হিয়ার মাঝে” লুকিয়ে থাকা আমার আমি বহির্বিশ্বের সঙ্গে প্রবল উচ্ছ্বাসে মিলন ঘটিয়ে “কি গান গাহিল রে” যা দু’শতক বাদেও একই ভাবে আমাদের হৃদয়ে প্রতিধ্বনিত হতে থাকবে –
“আজি এ প্রভাতে রবির কর
কেমনে পশিল প্রাণের পর,
কেমনে পশিল গুহার আঁধারে প্রভাতপাখির গান!
না জানি কেন রে এত দিন পরে জাগিয়া উঠিল প্রাণ।
জাগিয়া উঠেছে প্রাণ,
ওরে উথলি উঠেছে বারি,
ওরে প্রাণের বাসনা প্রাণের আবেগ রুধিয়া রাখিতে নারি।”

-     
প্রিন্সটন, নিউ জার্সি
১৭ই মে, ২০১৯



Sunday, April 14, 2019

হালখাতা

সকালের আমেজটা নিয়ে বন্ধ দোকানের সামনে এসে দাঁড়ালেন নিবারণ । গঙ্গাস্নান সেরে বাড়ীতে গৃহদেবতার পায়ে মাথা ঠেকিয়ে বেরিয়েছেন । বেরোবার সময় স্ত্রী সরমা নতুন পাঞ্জাবির পকেটে পূজোর ফুল দিয়ে বললেন, “বছরটা আমাদের ভাল কাটুক ।”

অ্যাসিস্টেন্ট পলাশ শাটারে টান দিয়ে দোকান খুলতেই নিবারণ কপালে হাত ঠেকিয়ে ভিতরে ঢুকলেন । দোকানের বড় ঘড়িতে তখন আটটা বেজেছে । কালীঘাটের এই অ্যাপ্লায়েন্সের শোরুমটায় বিপণন শুরু হতে এখনও ঘন্টাখানেক দেরী । তবে এই ‘হালখাতা’র দিনে নিবারণের বন্ধুবান্ধব-শুভানুধ্যায়ীরা একটু আগে থেকেই ভীড় করবেন । ড্রাইভার স্বপনকে শ্রীহরির দোকানে পাঠিয়ে দিয়েছেন কচুরি আর নিমকির অর্ডারের খোঁজ নিতে । মিষ্টি আসবে ভীমনাগের দোকান থেকে । আজ বহু বছর ধরে এই প্রথা চলে আসছে ।

শোরুমটা বছর পনেরো হলো হয়েছে । কলকাতা জুড়ে শপিং মল হওয়ার হিড়িক লাগতেই নিবারণ তাঁর ষাট বছরের স্যুটকেস-বেডিংয়ের দোকান উঠিয়ে দিয়ে ব্যাঙ্ক লোন নিয়ে শোরুমটা চালু করেন । মধ্যবিত্ত বাঙ্গালী আজকাল আকাশপথে উড়ে বেড়ায়, তাই তাদের স্যুটকেস-বেডিংয়ের প্রয়োজন ফুরিয়েছে । বরং ঘরের কাজ করার সময়ের অভাব, তাই অ্যাপ্লায়েন্সের চাহিদা বেড়েছে । ফলে আট বছরের মধ্যেই নিবারণ ব্যাঙ্ক লোন শোধ করে দিতে পেরেছেন ।

“স্যার, আপনার চা,” করিতকর্মা পলাশ ধূমায়িত কাপ আর সেই সঙ্গে দুটো ব্রিটানিয়া গুডডে বিস্কুট এনে রাখল নিবারণের সামনে । সকালে সরমা এক গ্লাস লেবুর শরবৎ তাঁকে বানিয়ে দিয়েছিলেন । হালখাতার খাওয়া-দাওয়া থাকবে বলে আর কিছু খাননি । 

“সজল তো এখনও এলো নারে, তুই একা দোকান সামলাতে পারবি তো,” চায়ে বিস্কুট ডোবাতে-ডোবাতে পলাশকে প্রশ্ন করেন নিবারণ, “আমাকে আবার খাওয়াদাওয়ার দিকটা দেখতে হবে আজ ।

“সে আপনি চিন্তা করবেন না । আজ সকালে বেশী কাস্টমার আসবে না । সব এখন ইন্ডিয়া-অস্ট্রেলিয়ার ওয়ান-ডে দেখছে এই ছুটির দিনে, নিবারণকে আশ্বস্ত করে পলাশ ।

সত্যি, বাঙ্গালীর হুজুগের অন্ত নেই । কলকাতায় এই নববর্ষ উদ্‌যাপন আজ প্রায় এক উৎসবে পরিণত হয়েছে । আগে ছিল চৈত্রের সেল, এখন টিভিতে একমাস ধরে বিজ্ঞাপন চলে নববর্ষ উপলক্ষ্যে কোথায় কি সেল চলবে ।  ওপার বাংলায় তো বর্ষবরণ এখন একটা জাতীয় উৎসব ।

‘ওপার’ বলতে বহুদিন আগের কথা মন পড়ল । নিবারণের খুব ছোটবেলাটা কেটেছে ময়মনসিংহে । তখন জ্যাঠতুতো-খুড়তুতো ভাইবোনদের সঙ্গে টাউনের হাতগুণতি কয়েকটা দোকানে ঘুরলে হালখাতায় বাতাসা বা নিদেনপক্ষে গজা মিলত । তারপর এল দেশভাগ আর সেইসঙ্গে দাঙ্গা । রাতারাতি গ্রামের জমিজিরাত-ঘরবাড়ী প্রায় জলের দরে বেচে দিয়ে তাঁদের জ্ঞাতিগুষ্টি উদ্বাস্তু হয়ে শিলচরে এসে আশ্রয় নিলেন ।

গ্রামের মাস্টার নিবারণের বাবা সাতজনের সংসারের অন্নসংস্থান করতে মুদির দোকান দিলেন । সেখানে হালখাতা বা নববর্ষ  উদ্‌যাপনের সুযোগ বা সঙ্গতি কোনটাই ছিলনা । সেই সময় বেশ কিছু বছর নববর্ষ কোথা দিয়ে আসত-যেত তার খেয়াল নিবারণ রাখেননি ।

যে বছর ম্যাট্রিক দেবেন সে বছর কাছাড় গণসংগ্রাম পরিষদের ডাকে সারা বরাক উপত্যকা উত্তাল হয়ে উঠল – রাজ্য সরকারের অসম ভাষাকে রাজ্যব্যাপী একমাত্র ভাষা হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়ার বিরুদ্ধে । শিলচর তথা বরাক উপত্যকাতে তখন লক্ষাধিক বাঙ্গালী রয়েছেন যাঁদের অধিকাংশ উদ্বাস্তু । নিবারণদের পরিবার ততদিনে একটু স্বচ্ছলতার মুখ দেখতে শুরু করেছে । মুদির দোকানের পরিবর্তে শিলচর শহরে এক বস্ত্রবিপণীর মালিক হয়েছেন তাঁরা

নতুন দোকানের প্রথম হালখাতা অনুষ্ঠান হবে, নিবারণের বাবা তাই নববর্ষের বেশ কিছুদিন আগে থেকেই তার প্রস্তুতিতে ব্যস্ত । অন্যদিকে নিবারণের জ্যাঠতুতো দাদা-দিদিরা গণসংগ্রাম পরিষদের স্বেচ্ছাসেবক হয়ে শিলচর-জুড়ে পিকেটিং করছেন । নিবারণের বাবার তাতে সম্মতি থাকলেও বাড়ীর বড় ছেলে নিবারণকে আসন্ন ম্যাট্রিক পরীক্ষার কথা বারবার মনে করিয়ে দিতেন । চৈত্র সংক্রান্তির দিন বিকেলে খবর এল এবারের নববর্ষের সূচনা হবে সত্যাগ্রহ দিয়ে – কাছাড় গণসংগ্রাম পরিষদ দিনটিকে ‘সঙ্কল্প দিবস’ বলে ঘোষণা করেছে ।

নববর্ষের দিন সকাল-সকাল নিবারণ বাবার সঙ্গে দোকানে পৌঁছে গেলেন, সঙ্গে আরো দুই ভাই-বোন । বেরোবার সময় জ্যাঠতুতো দাদারা সাবধান করে দিলেন যে গণ্ডগোল হতে পারে, সেই বুঝে যেন দোকান খোলা হয় । হালখাতার আয়োজন এক অনিশ্চিয়তার মধ্যে শুরু হল । ভাই-বোনদের নিয়ে নিবারণ কয়েকটা চাঁদোয়ার মালা দোকানের ভিতরে নানাদিকে ঝুলিয়ে দিলেন । নিবারণের বাবা জলখাবারের জোগাড়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন, এরমধ্যে একফাঁকে হালখাতার পূজোটা তাঁকে দিয়ে আসতে হবে ।

সকাল দশটা অবধি দু’একজন নিত্যখদ্দের আর পাড়া-প্রতিবেশী ছাড়া দোকানে কারুর পদাপর্ণ ঘটল না । চারিদিকে একটা থমথমে অবস্থা । আরো বেলার দিকে খবর এল তারাপুর স্টেশনে সত্যাগ্রহীদের ওপর অসম পুলিশ লাঠিচার্জ করেছে । খবরটা যেন বিদ্যুৎগতিতে ছড়িয়ে পড়ল । দোকানে বসে নিবারণ দেখলেন প্রায় পঞ্চাশ-ষাট জনের মতো ছেলেমেয়ে শিলচর পুলিশ স্টেশন ঘেরাও করবে দৌড়তে দৌড়তে চলেছে ।

“কিরে মিলু, তুই চুপচাপ বসে থাকবি নাকি? আয় আমাদের সঙ্গে আয়”, নিবারণ দেখলেন তাঁর সহপাঠিনী কমলা তাঁকে রাস্তা থেকে ডাকছে । কমলারা তাঁদের মতোই উদ্বাস্তু হয়ে এসেছিল, তবে সিলেট থেকে । কমলাদের পরিবার তখনও অভাব-অনটনের মধ্যে দিয়ে চলেছে । বেশ কয়েকবার নিবারণ তাকে পড়ার বইও ধার দিয়েছেন ।

“নারে, বাবা রাগারাগি করবেন । যে কোন সময়ে চলে আসবেন, পূজো দিতে গিয়েছেন,” নিবারণ কমলাকে নিরস্ত করার চেষ্টা করেন ।

“আমি মাস্টারমশাইকে বুঝিয়ে বলব । এখন তুই আয় আমাদের সঙ্গে,” কমলা প্রায় জোর করেই নিবারণকে দোকান থেকে টেনে বার করে । নিবারণের বাবা কমলা ও তাঁর সহপাঠীদের প্রায়শই সংস্কৃত পড়ায় সাহায্য করেন । সেইসূত্রে সহপাঠীরা নিবারণের বাবাকে ‘মাস্টারমশাই’ বলে ।

ভাইবোনদের মুখে আশংকার ছায়া দেখে নিবারণ দোনামোনা করতে থাকেন । ততক্ষণে ভীড়ের মধ্যে থেকে তাঁর ক্লাসের আরো কিছু ছেলেমেয়ে এসে নিবারণকে প্রায় কাঁধে তুলে নিয়ে এগোতে শুরু করে । পুলিশ যেন বিক্ষোভকারীদের জন্য প্রস্তুত ছিল । বাজারটা পেরোতেই কাঁদানে গ্যাসের চার্জ আরম্ভ হল । নিবারণ এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন কখনও হননি । মুহূর্তের মধ্যে জটলা ছত্রাকার হয়ে পড়ল । দিকভ্রান্ত হয়ে নিবারণও দৌড়লেন, চোখ জ্বলছে তাই দিক ঠাওর করতে পারলেন না । হঠাৎ হাতটা কে যেন চেপে ধরল, দেখলেন কমলা ।

“আমি জানতাম কাঁদানে গ্যাস চলবে, তাই এটা সঙ্গে করে এনেছিলাম,” কমলা তার হাতে ধরা কাপড়ের টুকরোটা নিবারণকে দেখায় । “চার্জ শুরু হতেই চোখে বেঁধে নিই । এখন চল, তোর একটা ব্যবস্থা করি । তোকে আবার দোকানে ফিরতে হবে তো ।”
কমলার সহায়তায় নিবারণ চোখমুখ ধুয়ে ঘন্টাখানেক বাদে দোকানে ফিরলেন । বলাবাহুল্য অনেক কঠিন জেরার মুখোমুখি হতে হল বাবার কাছে, যদিও পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার অনেক চেষ্টাই কমলা করেছিল । নিবারণের বাবা আর ঝুঁকি না নিয়ে দোকান বন্ধ করে ছেলেমেয়েদের নিয়ে বাড়ীর দিকে রওনা দিলেন ।

পরের একমাস নিবারণের স্কুল-আর-বাড়ী ছাড়া অন্য কোথাও যাওয়ার অনুমতি মিলল না । বরাক উপত্যকায় উত্তেজনা তখন তুঙ্গে উঠেছে ।  ম্যাট্রিক পরীক্ষা যেদিন শেষ হল, তার পরের দিনই শিলচর স্টেশনে পিকেটিং বসল । ওদিকে যতদিন না ম্যাট্রিকের ফলাফল বেরাচ্ছে, ততদিন নিবারণকে দোকানেই থাকতে হবে – এই মতো সিদ্ধান্ত নিলেন নিবারণের বাবা ।

পরের শুক্রবার, ১৯শে মে – দিনটা এখনও নিবারণের স্মৃতিতে জ্বলন্ত হয়ে আছে – সকাল-থেকে-সন্ধ্যা হরতালের ডাক দিল গণসংগ্রাম পরিষদ । নিবারণদের দোকানের ঝাঁপ বন্ধ থাকল, আর নিবারণ রইলেন বাড়ীতে আটকা পড়ে । দুপুরে খবর এল শিলচর স্টেশনে পুলিশ সত্যাগ্রহীদের ওপর গুলি চালিয়েছে, মারা গেছেন বেশ কিছু মানুষ আর আহত হয়েছেন অনেকে । বিকেলের দিকে জ্যাঠতুতো দাদাদিদিরা যারা পিকেটিং করতে গিয়েছিলেন তাঁদের মুখে নিবারণ জানতে পারলেন যে নিহতদের মধ্যে রয়েছে কমলাও । খবর পেয়ে বাড়ীতে কাউকে না জানিয়ে নিবারণ সোজা হাসপাতালের দিকে রওয়ানা দিলেন । কোথায় একটা অপরাধবোধ যেন তাঁকে তাড়িয়ে নিয়ে চলল । হাসপাতালে তখন জনারণ্য, সারা শিলচর যেন ভেঙ্গে পড়েছে । বেডেতে কমলা যেন এক মুখ প্রশান্তি নিয়ে ঘুমিয়ে আছে , পাশে তার শোকস্তব্ধ পরিবার । মাথার কাছের টেবিলে সেই কাপড়ের টুকরোটা – চোখের জলের বদলে রক্তে ভেজা ।

সেইদিনের পর নিবারণের জীবন অন্যখাতে বইল । কলকাতায় চলে এলেন কলেজে পড়তে । মায়ের এক মেসোমশাই যিনি কিনা প্রথম বিশ্বযুদ্ধে মেসোপটেমিয়ায় ছিলেন নজরুলের সঙ্গে, তাঁর বাক্স-বেডিংয়ের দোকানের তদারকি শুরু করলেন । নিঃসন্তান সেই মাসী-মেসো নিবারণকে খুব কাছের করে নিলেন ও তাঁদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি সব তাঁকেই লিখে দিলেন ।

“বাবা তোমার পূজো দেওয়া হয়ে গিয়েছে”, ফোনে বড় ছেলে কমলের গলা পেলেন, “আমরা আর একটুক্ষণের মধ্যে পৌঁছে যাচ্ছি ।”

“স্যার, সজল এসে গিয়েছে, আমরা ওদিকটা দেখছি,” শ্যামলের আশ্বাসবাণীও কানে এল ।

“স্যার, কচুরী আর মিষ্টি কি এখনই প্যাকেট করে দেব,” স্বপন এক ঝাঁকা-মুটে নিয়ে দোকানে ঢুকতে ঢুকতে জিজ্ঞাসা করে, “আমাকে আবার এখন বাড়ী গিয়ে বৌদিকে নিয়ে নিউ মার্কেট যেতে হবে, কমলদা বলে দিলেন ।”

Hi দাদু, এখন busy হওনি দেখছি,” ষোল বছরের নাতনী কাজল হৈ হৈ করে এসে পড়ল, “আজকে কিন্তু তাড়াতাড়ি শোরুম close করতে হবে । আমরা আজ lunch করতে যাব সপ্তপদীতে, বাবা reservation করে দিল ।” বাবা অর্থাৎ কমল, ছোটছেলে শোভন সপরিবারে থাইল্যান্ড বেড়াতে গিয়েছে ।

বরাক আন্দোলনের অর্ধশতাব্দীতে ষোল বছরের কমলার স্মৃতিতে শিলচরের স্কুল-প্রাঙ্গণে তার এক আবক্ষমূর্তি স্থাপন করা হয় – ভাষা-শহীদদের মধ্যে একমাত্র মেয়ে সে । নিবারণ সেই প্রচেষ্টায় আর্থিক সাহায্য করে থাকেন । পূজোর ফুল ছুঁইয়ে যে লাল খেরোর খাতা কমল নিয়ে আসছে, তা নিবারণ সিন্দুকে তুলে রাখবেন । ব্যবসার হিসেবনিকেশ এখন সব কম্পিঊটারেই হয় ।


প্রিন্সটন, নিউ জার্সি
১৪ই এপ্রিল, ২০১৯
(চৈত্র সংক্রান্তি, ১৪২৫)

Friday, March 29, 2019

অভিশপ্ত গড়


“সাব, আপকা কৌনসা রিজারভেশন হ্যায় কহা আপনে?”

“এসি স্লিপার”, ভিড় ঠেলে কুলির পিছনে হাঁপাতে হাঁপাতে এগোতে থাকি হাওড়া স্টেশনের আট নম্বর প্ল্যাটফর্ম ধরে । মালপত্র বিশেষ নেই, কেবল একটা স্যুটকেশ আর কাঁধের ব্যাগ । ও দুটোই আপাতত কুলির জিম্মায় ।
সপ্তাহখানেক আগে অফিসফেরতা মিনিবাস থেকে নামার সময় একটা অটো হুড়মুড়িয়ে ঘাড়ের ওপর এসে পড়ে । টাল সামলাতে না পেরে পড়ে যাই রাস্তায় । আশপাশ থেকে লোকজন দৌড়ে এসে উঠতে সাহায্য করে । বাড়ী ফিরে বুঝি ডান কাঁধটায় বেশ চোট লেগেছে । মাকে আর জানাইনি এমনিতেই চিন্তা করেন কলকাতার  গাড়ীঘোড়া নিয়ে, এই অ্যাকসিডেন্টের কথা শুনলে তো আর রক্ষা নেই । অতঃপর নিজেই নিজের চিকিৎসা করছি পাড়ার সুবিমলের ডিসপেনসারির কৃপায় । বলাবাহুল্য যে আমার এই শারীরিক অবস্থায় কুলির শরণাপন্ন হব ।
ট্রেনটা ছাড়তে বিশেষ বাকী নেই, বড়জোর মিনিট দশেক । এতটা দেরী হওয়ার কারণ কলকাতার পূজোর ভীড় । আজ চতুর্থী, কিন্তু তাতে দর্শনার্থীদের উৎসাহে কোন ভাঁটা নেই । আজকাল কলকাতা শহরে অনেক বারোয়ারী পূজোর নাকি চতুর্থীতেই উদ্বোধন হয় । সেই ভয়ে আমি দুপুর-দুপুর অফিস থেকে বাড়ী চলে এসেছি । মোদ্দাকথা এন্টালি থেকে এই হাওড়া স্টেশনে ট্যাক্সি করে আসতে পাক্কা দু’ঘন্টা লেগেছে ।  বাড়ী থেকে বেরোতেও আমার দেরী হয়েছিল । মামা-মামীর আসার কথা ছিল বিকেল পাঁচটায়, কিন্তু তাঁরা পৌঁছলেন সন্ধ্যে সাতটায় । সেখানেও দু’টি ঘন্টা দেরী, ওই একই কারণে ।
“মেরে খেয়াল মে ইঁহাই আপকা কামরা হোগা ।” কুলি সঠিক এসি স্লিপার কোচের সামনে এসে দাঁড়াল । আমিও কামরার বাইরে সাঁটা কাগজে যাত্রীতালিকার ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ে আমার নামের খোঁজে লেগে গেলাম । “এই তো,” নিজের নাম দেখে বহুদিন আগের কলেজ অ্যাডমিশনের কথা মনে পড়ে গেল । অনেক উৎসুক ছাত্রছাত্রীর এবং তাদের পরিবারদের ভিড়ে মিশে নিজের নাম খোঁজার প্রয়াসের চেয়ে এ কিছু কম নয় ।
“হাঁ, হাঁ, ইধারই – সামান উতারো ।”  বেশ আত্মবিশ্বাসের সুরে কথাটা বললাম । কুলির সহায়তায় সিটটা খুঁজে পেতে বেশী সময় লাগল না । ষাট টাকায় রফা হয়েছিল দিলাম আরও পাঁচটাকা বেশী, পূজো বাবদ । কুলি খুশী মনেই বিদায় নিল । আমিও আর দেরী না করে স্যুটকেশ থেকে একটা চাদর বার করে সীটের ওপর রেখে দিলাম । এটা গায়ে দেওয়ার বাকী বিছানার ব্যবস্থা রেল কর্তৃপক্ষ করে দিয়ে থাকেন এসি স্লিপার কোচের যাত্রীদের জন্য । রাতের খাওয়াটা বাড়ীতে সেরেই বেরিয়েছি, এখন তবে শয্যাগ্রহণ করলেই হয় । ভাবতে ভাবতেই দেখি ট্রেনটা একটা ঝাঁকুনি দিয়ে স্টেশন ছেড়ে বার হল ।
এতো গেল এই কাহিনীর মুখবন্ধ । এখন আমার পরিচয়টা দিই ।
আমার নাম প্রণবেশ মুন্সী । কলকাতার এক বেসরকারী কোম্পানীতে ম্যানেজারের কাজ করি । প্রায় পঁচিশ বছর আগে ঢুকেছিলাম চালানের হিসাব মেলানোর কাজে, এখন বয়স পঁয়তাল্লিশ । বাড়ীতে আমি বাদে আছেন মা । বাবা গত হয়েছেন বছর দশেক হল । বাড়ীটা বাবাই করে গিয়েছেন । জীবনে কোনরকম উচ্চাশা নেই আমার, তবে নেশা আছে – বেড়ানোর । আপাতত চলেছি দিল্লী ।
মাস ছয়েক আগে সমররের কাছ থেকে হোয়াটসঅ্যাপে একটা মেসেজ পেলাম – পূজোতে সিতাংশু সপরিবারে বেড়াতে আসছে । সমর, সিতাংশু আর আমি – স্কুল জীবন থেকে হরিহর আত্মা । একসঙ্গে কলেজেও পড়েছি । পাশ করার পর সমর দিল্লী চলে যায়, আর সিতাংশু ডিব্রুগড় । একমাত্র আমিই কলকাতার মাটি আঁকড়ে পড়ে থাকি । আমার উপায়ও ছিলনা, বাবাকে শারীরিক কারণে সময়ের আগেই রিটায়ারমেন্ট নিতে হয়েছিল । আমরা তিনজনে ছড়িয়ে গেলেও যোগাযোগটা থেকে যায় । তাছাড়া সমর আর সিতাংশু কাজে বা পারিবারিক কারণে মাঝেমধ্যে কলকাতায় আসে । এবারে অনেকদিন বাদে আমরা তিন মূর্তি একত্রিত হচ্ছি এই পূজোর অবসরে ।
ঘড়িতে দেখলাম রাত বারোটা বেজেছে । কাঁধের ব্যাগটা নিয়ে সোজা ওপরের বার্থে উঠে একটা পাতলা চাদর বার করে পায়ের কাছে রেখে দিলাম । বালিশ আর তলায় পাতা চাদর রেল কোম্পানীর দৌলতে মজুত রয়েছে । মায়েরা কি শুয়ে পড়েছেন? হয়ত তিনজনে মিলে গল্প করছেন । মামা-মামী বেহালার বাড়ী বন্ধ রেখে মায়ের সঙ্গেই থাকবেন, অন্ততঃ যে ক’টা দিন আমি বাইরে রয়েছি । সমর আর সিতাংশুকে হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ ছেড়ে দিলাম আমার বর্তমান অবস্থান জানিয়ে ।
সমররা বলেছিল প্লেনে করে চলে আসতে । ভাড়াটা প্রায় একই, অথচ সময় দশভাগের এক ভাগ । কিন্তু আমি নাছোড়বান্দা, আসব তো ট্রেনে চেপেই আসব । ট্রেনের এই দোলানিটা ভারী ভাল লাগে । দুলতে দুলতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছি তার খেয়াল নেই । ঘুম ভাঙ্গল পায়ে টোকাতে । দেখি টিকিট চেকার । ঘুমের মধ্যে হাতড়ে টিকিট বার করে দিলাম । চেকার সাহেব গম্ভীর মুখে একে একে টিকিটের তদন্ত করে যাচ্ছেন । কোন এক যাত্রীকে জানালেন যে তিনি মোগলসরাই অবধি ডিউটিতে আছেন । তার মানে এতটা রাস্তা এই গম্ভীর মুখদর্শন করেই কেটে যাবে ।
রাতের ঘুমটা ভালই হল । যখন ঘুম ভাঙ্গল, তখন বেলা অনেকটাই গড়িয়ে গিয়েছে । দাঁত মেজে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে দাড়িটা কামাব কিনা ভাবছি, গলার খাঁকারিতে সম্বিৎ ফিরল । স্বাস্থ্যবান, ছোটখাট চেহারার এক ভদ্রলোক আমাকে বললেন, “আপনাকে দেখলাম ওপর থেকে নামতে । এই দেখুন, আমি বাঙালি ভেবেই বাংলা বলে ফেললাম ।”
“হ্যাঁ, হ্যাঁ, আমি বাঙালি । আপনি বুঝি লোয়ার বার্থের –”
সকাল সকাল ওপরে উঠে পড়েছিলাম, তাই নিচের যাত্রীর দেখা পাইনি । ভদ্রলোক চোখেমুখে ঔৎসুক্য নিয়ে একটু হেসে ঘাড় নাড়লেন । বুঝলাম ওনাকে মুখ ধোয়ার জায়গা করে দিতে হবে । ফিরে এসে লোয়ার বার্থে বসলাম ।  একটু চা পেলে মন্দ হত না, আজ এই সময় বাড়ীতে থাকলে মা সামনে কাপ এনে ধরতেন । সে কথা ভেবে পকেট থেকে মোবাইল বার করে মাকে ফোন করলাম । মামা-মামীর সঙ্গে বসে মা সকালের চা উপভোগ করতে করতে নাকি আমার কথাই বলছিলেন । মার সঙ্গে কথা শেষ হতে না হতেই লোয়ার বার্থের সেই ভদ্রলোকটি আবির্ভূত হলেন ।
তোয়ালেতে মুখ মুছতে মুছতে ভদ্রলোক লুঙ্গি গুটিয়ে পাশে বসে একটু হতাশার সুরে বললেন, “এসি ক্লাসের এই এক মুশকিল । চাইলেই চা পাওয়া যায় না । কখন ব্রেকফাস্টের অর্ডার নিতে আসবে কে জানে । আমার নাম গণেশ সিং । জয়পুর যাচ্ছি । আপনি – ”
এক নিশ্বাসে কথাগুলো আউড়ে যান ভদ্রলোক ।
“আমি প্র–” আমার পরিচয়টা সবে দিতে যাব, দেখি উর্দিপরা বেয়ারা সামনে এসে দাঁড়িয়ে ।
“নিন, আপনার ব্রেকফাস্ট এসে গিয়েছে ।” গণেশবাবু কালবিলম্ব না করে মাখন-টোস্ট, দুটো হাফবয়েল ডিম আর চায়ের অর্ডার দিয়ে ফেললেন । ভদ্রলোকের দেখাদেখি আমিও আমারটা দিলাম, তবে ডিম একটা ।
বেয়ারা চলে যেতে গণেশবাবু গেঞ্জীর ওপর পাঞ্জাবি গলিয়ে চুল আঁচড়ে বালিশের তলা থেকে পূজোবার্ষিকী বার করে কোলের ওপর নিয়ে বসলেন । বুঝলাম গতকাল রাতে যতটুকু পড়া হয়েছে সেইটা এখন শেষ করবেন, অর্থাৎ কথপোকথন এর থেকে বোধহয় আর এগোবে না ।
 আমি আর কালবিলম্ব না করে আমার পরিচয়টা জানিয়ে দিলাম সেইসঙ্গে আমার গন্তব্যস্থল যে ওনার থেকে পৃথক সেটাও জানাতে ভুললাম না ।
আমার হাতের মুঠোতে মোবাইল দেখে ভদ্রলোক প্রশ্ন করেন, “আপনার মোবাইলটা কি আমি একটু ব্যবহার করতে পারি । আমারটার চার্জ চলে গিয়েছে, চার্জ দিতে বসিয়েছি ।আমি আগ্রহভরে ফোনটা এগিয়ে দিই । উনি কালবিলম্ব না করে মোবাইলটা নিয়ে জানলার বাইরে তাকিয়ে কারুর সঙ্গে হিন্দিতে কথপোকথন শুরু করেন । বুঝলাম থাকার একটা বন্দোবস্ত করতে চাইছেন, সম্ভবতঃ জয়পুরে
কথা শেষ হলে গণেশবাবু হাতে হাতে মোবাইল ফেরত দিতে গিয়ে মন্তব্য করলেন, “দিল্লীতে কি দেখবেন, তার চেয়ে রাজস্থান চলুন
আগে খেয়াল করিনি, এবারে মনে হল ভদ্রলোকের “দিল্লী”, “রাজস্থান” শব্দগুলোর উচ্চার একটু হিন্দী ঘেঁষা ।
“আমি তো পূজো পড়লেই বেরিয়ে পড়ি । রাজস্থানেই যাই, তবে দু-একবার সিমলা আর তার আশপাশ জায়গাগুলোও ঘুরেছি ।”
“রাজস্থানে আপনার বুঝি কেউ থাকেন,” আমার মুখ থেকে কথাটা ফস্‌ করে বেরিয়ে যায় ।
ভদ্রলোক এক মুহূর্ত আমার মুখের দিকে ভাবলেশহীন চাহনি দিয়ে ঘাড় নাড়েন, “না!”
প্রসঙ্গটা ঘোরাতেই কিনা জানিনা, শারদীয়া পত্রিকাটা আমার দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, “নিন পড়ুন । পত্রিকা পড়া ছাড়া আরও একটা বিশেষ কাজে আসে – ট্রেনের বালিশগুলো বেশ নিচু, তাই একে আমি বালিশের তলায় গুঁজে রেখেছিলাম ।”
“সাব, আপকা নাস্তা ।”
দেখি দুই বেয়ারা আমাদের দু’জনের জন্য ট্রে হাতে দাঁড়িয়ে । আমরা কালবিলম্ব না করে প্লেটের ওপর মনোনিবেশ করলাম । পাঁউরুটি-ডিম গলাধঃকরণ করে চায়ের কাপে একটা চুমুক দিয়ে গণেশবাবু সিটের তলায় রাখা হাতব্যাগ থেকে একটা মাঝারী সাইজের বই বের করলেন । মলাটে লেখা দেখি “সেরা ভূতের গল্পসংকলন” ।
“আমার আবার শারদীয়ার গল্পের থেকে এই বইয়ের গল্পগুলো বেশী ইন্টারেস্টিং লাগে ।”
বুঝলাম গণেশবাবু দিনের বেলাতেও ভূতের সংসর্গ ছাড়বেন না । আমি একটু মুচকি হেসে শারদীয়া পত্রিকার পাতা উল্টোতে থাকি । একটুক্ষণ বাদে নাক ডাকার শব্দে নজর যায় গণেশবাবুর দিকে, দেখি ভদ্রলোক গল্পসংকলনটি বুকের ওপর খোলা রেখে স্বপ্ন রাজ্যে পাড়ি দিয়েছেন । আমিও ওনার ঘুম ভাঙ্গার আশায় না থেকে, শারদীয়া পত্রিকাটি বগলদাবা করে আমার জায়গায় ঊঠে বসলাম ।
আরও বেশ খানিকক্ষণ চলার পর দেখি গাড়ী ঢুকছে মোগলসরাই স্টেশনে । অর্থাৎ আমাদের কামরার টিকিটচেকার বদল হওয়ার পালা । স্টেশনে গাড়ী থামতেই মনটা চায়ের আশা করতে লাগল । ব্রেকফাস্টের চা-টা ঠিক জুতের হয়নি । এসি কামরার জানলা আবার খোলা যায়না ।  অগত্যা দরজার কাছে গিয়ে মুখ বাড়িয়ে এক চা-ওয়ালাকে হাত নেড়ে ডাকলাম । কাগজের কাপ থেকে চা চুমুক দিতে দিতে চা-ওয়ালাকে পরিবেশ দূষণে প্লাস্টিকের ভূমিকা এবং মাটির ভাঁড়ের উপকারিতা নিয়ে নাতিদীর্ঘ একটা বক্তৃতা দিয়ে ফেললাম । চা শেষ করে কি মনে হল – “আউর এক চায়” বলে – গণেশবাবুর জন্য এক কাপ নিয়ে নিজের কূপে ফিরলাম ।
কূপের বাইরে দেখি চেকারের পোষাক পরে একজন বয়স্ক মানুষ । বুঝলাম ইনিই আমার বাকী পথের সঙ্গী । গণেশবাবু তখনও স্বপ্নরাজ্যে বিচরণ করছেন । একটু জোরে গলা খাঁকারি দিতে ওনার ঘুম ভাঙ্গল । মুখের সামনে ধোঁয়া ওঠা চা দেখে এক গাল হাসি নিয়ে ভদ্রলোক উঠে বসলেন । রাতের বেলা ভাল ঘুম হয়নি হয়ত ।
“আপনার ভূতেরা কি বলছে? এই চলন্ত ট্রেনে তাদের উপস্থিতি কি টের পাচ্ছেন?”
ভদ্রলোক দু-হাতে ধরা চায়ের কাপে সুড়ৎ করে টান দিয়ে ঘাড় নাড়লেন । “তবে একটা জব্বর গল্প শুরু করেছি মশাই, নেহাত ঘুমিয়ে পড়েছিলাম –”
“কি গল্প তা শুনতে হচ্ছে তবে ।”
গণেশবাবুর চা-পর্ব শেষ হতে না হতেই, লাঞ্চের অর্ডার নিতে বেয়ারা উদয় হল । গণেশবাবু দেখলাম এবারে পুরোপুরি নিরামিষ থালির অর্ডার দিলেন ।
“ডিম অবধি আমিষত্ব আয়ত্ত করেছি মশাই । তবে এই ট্রেনের নিরামিষ রান্নাটা মন্দ করে নয় ।” আমার মনে যে প্রশ্নটা জেগেছে সেটার উত্তর দিতেই যেন কথাটা বললেন ভদ্রলোক ।
বেয়ারা অর্ডার নিয়ে চলে যেতেই গণেশবাবু বইটা খুলে বসলেন ।
“গল্পটার নাম ‘অভিশপ্ত গড়’ । রাজস্থানের ভানগড় দুর্গের নাম শুনেছেন? খুব ফেমাস, ভৌতিক ব্যাপার-স্যাপারে । এখন তো ট্যুরিজিমের দৌলতে সারাক্ষণ ভীড় লেগেই আছে ওখানে । তবে এই গল্পটা প্রায় নব্বই বছর আগের । ভানগড় তখন আলওয়ার রাজার এস্টেটে । রাজামশাই বাঙ্গালীদের খুব সুনজরে দেখতেন । কলকাতা থেকে একটি অল্পবয়সী ছেলেকে একান্ত সচিব করে  আলওয়ারে নিয়ে আসেন । ছেলেটির নিজের চালচুলো নেই, তাই রাজার আশ্রয়ে বেশ স্বাধীনভাবে দিন কাটতে শুরু করেছিল । গল্পটা সেই ছেলেটির কথায় বলা । সবে শুরু করেছি, কিন্তু মনের মধ্যে অনেক প্রশ্ন জেগে উঠেছে ।”
ণেশবাবুর পর্যালোচনা শুনতে শুনতে কখন যে চোখ লেগে এসেছিল টের পাইনি । ভরপেট লাঞ্চ খাওয়ার পর যে একটা দিবানিদ্রার বিশেষ দরকার রয়েছে তা মালুম হল । কথা না বাড়িয়ে সোজা ওপরে উঠলাম, সঙ্গে শারদীয়া পত্রিকা । থাক গনেশবাবু তাঁর জব্বর গল্প নিয়ে, আমার এখন একটা ততধিক জব্বর ঘুমের প্রয়োজন । পত্রিকাটা বুকের ওপর খুলে কাম্বডিয়া ভ্রমণের কাহিনী পড়তে আরম্ভ করলাম ।
ট্রেনের দোলানিতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম খেয়াল নেই । ঘুম ভাঙতে দেখি আমি এক উটের পিঠে চড়ে চলেছি । সামনে বিশাল এক দরজা, কাঠের পাটাতনের ওপর দিয়ে পরিখা পার হয়ে সেই দরজায় পৌঁছন যায় । দরজার পিছনে কেল্লার উঁচু প্রাচীর । দুই যমদূতের মত প্রহরী দরজার দু’পাশে দাঁড়িয়ে, তাদের হাতে ইয়া বড় বল্লম ।
“আগে ন বড়ে,” হুঙ্কার দিয়ে বল্লম আড়াআড়ি করে পথ আগলে দাঁড়াল তারা ।
“লেকিন মোহে বঠে সিধারো,” আমার মুখ দিয়ে দেখি এক অদ্ভুত হিন্দী বার হয়ে এল । কানের কাছে কি একটা যেন হাওয়ায় লৎপৎ করছে । হাত দিয়ে দেখি একটুকু কাপড় যার শেষ হয়েছে মাথার পাগড়িতে । আমার পরণে যে বেশভূষা তা কেবল ছবিতেই দেখেছি । রাজস্থানের রাণা-মহারাণারা এই ধরণের পোষাক পরতেন । আমার মাথা ঝিমঝিম করতে লাগল ।
“উসে আনে দো,” এক মহিলা কন্ঠের আওয়াজে চমকে উঠলাম । দেখি কেল্লার প্রাচীরে এক অপরূপা সুন্দরী, আমাকে ইঙ্গিত করে প্রহরীদের নির্দেশ দিচ্ছে
“মহনা থারা সে বাত করনি হো,” সুন্দরী আমার দিকে আকুল হয়ে বললেন । আমি ব্যাপারটা কি হৃদয়ঙ্গম করার চেষ্টা করলাম ।
“হুজুর আপ মৎ যাইয়ে । আপকো জান খৎরে মে হ্যায়,” চেনা গলায় কে যেন বলে উঠে আমার পা চেপে ধরল । আর সেই হ্যাঁচকা টানে আমি উটের পিঠ থেকে পড়ে গেলাম ।
চোখ খুলতে দেখি ট্রেনের ছাদ । আমার পা ধরে ঝাঁকুনি দিচ্ছেন গণেশ সিং । বুঝলাম এতক্ষণ স্বপ্ন দেখছিলাম ।
“আপনি বলেছিলেন দিল্লীতে নামবেন । ট্রেন এখন দিল্লী ক্যান্টনমেন্টে ঢুকছে ]”
আমি তড়িঘড়ি করে চাদর গুটিয়ে বাঙ্ক থেকে নেমে পড়লাম । স্যুটকেশের মধ্যে জিনিসপত্র গোছাতে গোছাতে মনে হল স্বপ্নের মধ্যে শোনা শেষ গলাটা গণেশ সিংহের ।
অবশেষে ট্রেনটা নিউ দিল্লী স্টেশনে পৌঁছল । জানলা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে দেখি সমর দাঁড়িয়ে । হাত নেড়ে ওকে দরজার কাছে আসতে বললাম । স্যুটকেশটা হাতে ঝোলাতেই কাঁধের ব্যথাটা চাগাড় দিয়ে উঠল । আমার মুখের অবস্থা দেখে গণেশবাবু নিজের থেকে এগিয়ে এসে স্যুটকেশটা নিলেন,  তারপর আমার পিছুপিছু দরজা অবধি এসে সেটাকে সমরের কাছে চালান করে নিশ্চিন্ত হলেন । ধন্যবাদ দিতেই তিনি রাজস্থানে আসার অফারটা মনে করিয়ে দিলেন ।
পূজোর কটা দিন দিল্লীতে হৈ-হৈ করে কেটে গেল । চিত্তরঞ্জন পার্কের পূজোর সেক্রেটারী সমর, ফলে আমাদের আবার স্পেশাল খাতির । সমর আর সিতাংশুর পরিবারের সঙ্গে সকাল থেকে সন্ধ্যে প্যান্ডেলে আড্ডা দেওয়া আর সেইসঙ্গে খাওয়াদাওয়া চলল । ফাঁকেফোকরে ফোন করে মায়ের খবরাখব নিচ্ছিলাম তবে ট্রেনে দেখা সেই অদ্ভুত স্বপ্নের কথা মনে পড়লেই কেমন যেন অসোয়াস্ত্বি বোধ করছিলাম ।
একাদশীর রবিবারের দুপুরবেলায় খেয়েদেয়ে উঠে সমরদের বাইরের ঘরে বসে আমরা আড্ডা দিচ্ছি, এমনসময় এক মাঝবয়সী ভদ্রলোকের আবির্ভাব হল । সমর পরিচয় করিয়ে দিলবৃজ তানওয়ার । ভদ্রলোকের হ্যান্ডিক্রাফটসের ব্যবসা । জয়পুর থেকে মার্বেলের মূর্তি, গয়নাগাঁটি, পটারি ইত্যাদি এনে দিল্লীতে বিক্রী করেন । কনট প্লেসে দোকান, নাম আলওয়ার ট্রেডিংস । আলওয়ারে আদিবাসস্থান, সেইসূত্রে দোকানের নাম । আসন্ন দেওয়ালী উপলক্ষ্যে যাচ্ছেন জয়পুর, নতুন মাল আনতে । ফিরবেন দু’দিন পরে । সমরদের কিছু লাগবে কিনা, তা জানতে এসেছেন ।
সমরই প্রস্তাবটা দিল
“প্রণব, তোর তো আলওয়ারের দিকটা ঘোরা নয় । সিতাংশু আর আমরা বছর পাঁচেক আগে গিয়েছিলাম । মিস্টার তানওয়ার যাচ্ছেন, তুই ওনার সঙ্গে ঘুরে আয় । রাজস্থানের ওই জায়গাগুলোর একটা আলাদা ঐতিহ্য রয়েছে । এই সু্যোগ হাতছাড়া করিস না ।”
প্রস্তাবটা নেহাতই ফেলনা নয় । গণেশ সিংও তো রাজস্থান যেতে বলেছিল । আমার দিল্লী থেকেই ফিরে যাওয়ার পরিকল্পনা । সেইমতো টিকিটও কেটেছি, লক্ষ্মীপূজোর দিন যাতে বাড়ী পৌঁছে যাই । এখন বৃজ তানওয়ারের দোসর হয়ে গিয়ে ঠিক সময়মত ফিরতে পারব তো ? মনটা কিন্তু-কিন্তু করতে লাগল । ভদ্রলোক বোধহয় সেটা আঁচ করতে পেরে আশা দিতেই বললেন, “ডোন্ট ওয়ারি প্রণবজী, আই উইল ব্রিং ইউ ব্যাক অন টিউসডে ইভনিং । আই উইল পিক ইউ আপ এ্যাট সিক্স ইন দ্য মর্নিং, শার্প ।”
সোমবার ঠিক ছটায় সমরদের বাড়ীর সামনে একটা সাদা রঙের ইনোভা এসে দাঁড়াল । চালকের আসনে বৃজ তানওয়ার, চোখে কালো চশমা । সমরের কাছ থেকে একটা ছোট স্যুটকেশ ধার করেছি, দুদিনের জামাকাপড় যাতে এঁটে যায় । স্যুটকেশটা গাড়ীর পিছনে মালপত্রের সঙ্গে রেখে চালকের পাশের আসনে বসলাম ।  
দিল্লী-আলওয়ার দূরত্বটা অতিক্রম করতে ঘন্টা তিনেকের কাছাকাছি লেগে যাবে । সকাল-সকাল পথে বেরনো হয়েছে যাতে করে ট্র্যাফিকটা এড়ানো যায় । তানওয়ার খোলাখুলি জানিয়ে দিলেন যে ওনাকে সময় মেপে চলতে হবে । ব্রেকফাস্টের জন্য একবার থামবেন, খুব জরুরী দরকার না হলে আর নয় । লাঞ্চটা আলওয়ার পৌঁছে করা হবে ওনার জানা এক বিশ্বস্ত দোকানে । আলওয়ার শহরটা ঘুরে আমরা জয়পুর যাব । রাতটা থাকব জয়পুর সার্কিটহাউসে, রাজস্থান সরকারের এক বড় আমলা তাঁর স্কুলের সহপাঠীর জন্য ওই ব্যবস্থাটুকু করে দিয়েছেন । তবে এই দুদিন খাওয়াটা পুরোপুরি নিরামিষাশী, আমাকে একটু অ্যাডজাস্ট করে চলতে হবে ।
“আপ ফিকর মৎ কিজিয়ে । আই ক্যান ম্যানেজ ভেজিটারিয়ান ফুড,” আমার গাইডকে আশ্বস্ত করতেই কথাটা বললাম ।
বৃজ তানওয়ার যে পাকা ড্রাইভার, সেটা ওনার চালানোর দক্ষতায় মালুম হল । দিল্লী-জয়পুর হাইওয়ে ধরে ঘন্টা দেড়েক যাওয়ার পর রাস্তার ধারে একটা ধাবাতে আমরা থামলাম । খাঁটি ঘিয়ে প্রস্তুত বাজরার রুটি আর আচার দিয়ে প্রাতরাশ সারলাম, সেই সঙ্গে উটের দুধের চা । পথে আসতে আসতে ভদ্রলোক তাঁর ব্যবসা সংক্রান্ত নানা অভিজ্ঞতার কথা বলছিলেন ।
কনট প্লেসের দোকান প্রধাত বিদেশী পর্যটকদের পৃষ্টপোষকতায় চলে । ধাতুর তৈরী গয়নাগাটি – মীনাকারি, কুন্দন, ইত্যাদি কারুকার্জ করা অলঙ্কার  – এসবের খুব চাহিদা বিদেশীদের কাছে । জয়পুরের জহুরী বাজার থেকে পাইকারী দরে তিনি এগুলো কিনে থাকেন । রাজস্থানী শাল এবং স্কার্ফেরও যথেষ্ট চাহিদা আছে । জামাকাপড়ের সওদা করেই তাঁর ব্যবসায়িক জীবনের শুরু । ধীরে ধীরে অন্যান্য জিনিসের সংস্থান রাখেন ব্যবসাতে । ইদানীং নীল রঙের পটারির বিক্রিও ভাল হচ্ছে । এবারে যে পণ্যদ্রব্য বেশী করে আনবেন তা হল মিনিয়েচার পেন্টিং – রাধা-কৃষ্ণ থেকে মুঘল সম্রাট-সম্রাজ্ঞী, পশুপাখি ইত্যাদি, কি নেই সেখানে । তবে একটু দেখেশুনে কিনতে হবে কারণ অনেক ছবির রং পাকা হয়না । আলওয়ারে একজন আর্টিস্ট আছেন যিনি এবিষয়ে তাঁকে সাহায্য করছেন ।
সকাল দশটার একটু আগেই বৃজ তানওয়ারের ইনোভা আলওয়ার প্যালেসের সামনে এসে দাঁড়াল ।
“হম হিয়াঁসে শুরুয়াৎ করেঙ্গে,” ভদ্রলোক গাড়ী থেকে নেমে প্যালেসের দরজার দিকে এগোতে থাকেন । বলাবাহুল্য আমিও তাঁর পিছু নিই । রাজপুত আর ইসলামী স্থাপত্যশৈলীর সংমিশ্রণ ঘটেছে এই প্রাসাদ নির্মাণে । এর ভিতরকার মিউজিয়ামে দুষ্প্রাপ্য কিছু দলিল ও রাগমালা ছবি আছে । কিন্তু সব খুঁটিয়ে দেখার সময় নেই । এখানের সরকারী অফিস থেকে তানওয়াকে পারমিট তুলতে হবে দুপুরের ঝাঁপ পড়ার আগেই
আধঘন্টা বাদে পারমিট সঙ্গে করে আমরা প্যালেস থেকে বেরলাম । আমি অবশ্য ওরই ফাঁকে ভিতরে খানিকটা ঘুরে নিয়েছি । গাড়ীতে উঠতে গিয়ে তানওয়ারকে একটু বিব্রত বলে মনে হল । তাও সাহস করে বলে ফেললাম, “তানওয়ারজী, হম আগে কঁহা যা রহে হে ?”
“আব চলে, আলওয়ার ফোর্ট চলে,” বলে বৃতানওয়ার চোখের ওপর কালো চশমাটা টেনে ইনোভা স্টার্ট করলেন ।  মিনিট পঁয়তাল্লিশ বাদে আমরা আরাবল্লী পাহাড়ের ওপর দুর্গের প্রাকারের বাইরে এসে পৌঁছলাম। আসার পথে তানওয়ার গাড়ি থামিয়ে কর্নী মাতার থানে মাথা ঠেকিয়ে এলেন । জানিনা ঈশ্বরভক্তিটা সাময়িক কিনা ।
আলওয়ার ফোর্ট থেকে পুরো আলওয়ার শহরটা দেখা যায় । এই জায়গায় দশম শতাব্দীতে এক মাটির দুর্গ ছিল । তার ভিত্তির ওপর পঞ্চদশ শতাব্দীতে খানজাদা রাজপুত শাসকরা এই দুর্গের পত্তন করেন । তাই এই দুর্গের নাম বাল কেল্লা । সাড়ে সাত বর্গ কিলোমিটারের দুর্গ, পুরোটা ঘুরতে ঘন্টা তিনেক লেগে যাবে । আলওয়ার শহরটা যে দিকে তার অন্যদিকে সরিস্কা টাইগার রিজার্ভ । আমাদের জয়পুর যাওয়ার পথে পড়বে । একঘন্টা ঘোরার পর খিদেটা বেশ চাগিয়ে উঠল । লাঞ্চের কথা তানওয়ারকে বলাতে উনিও রাজী হয়ে গেলেন ।
দিল্লী-জয়পুর হাইওয়ের ধারে সদ্য গজিয়ে ওঠা একটা রিজর্টের ভিতরে শুদ্ধ ভোজনালয় দেখে ঢুকে পড়লাম । তানওয়ার আগেও এখানে এসেছেন । কোণা দিকের একটা টেবিল দেখে আমরা বসলাম । আশেপাশে আরও কাস্টমার ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে, দেখে মনে হল হাইওয়ের যাত্রী । আমরা লাঞ্চ থালির অর্ডার দিলাম । বেয়ারা চলে যেতেই তানওয়ারের ফোন এল । আমিও একটা সুযোগ পেলাম বাথরুমে যাওয়ার, তার প্রয়োজনে পড়েছিল অনেকক্ষণ আগেই । বাথরুম থেকে বেরবার মুখে আমার পকেটের মোবাইল বেজে উঠল । এখন আবার কে ফোন করল । সমরের সঙ্গে তো সকালেই কথা হয়েছে ।
মোবাইলে যে নম্বরটা উঠেছে সেটা অচেনা । দোনামনা করে ফোনটা অন করতেই যে গলাটা পেলাম, সেটা একান্ত অপ্রত্যাশিত – গণেশ সিং । সত্যি বলতে কি, আমি প্রথমে বুঝতে পারিনি । গণেশই পরিচয় দিল, আমি তো অবাক ।
“স্যার, চিনতে পেরেছেন জেনে ভাল লাগল । আপনি তাহলে ফাইনালি এলেন রাজস্থানে । দিল্লী ঘোরা কেমন হল?”
“আমি যে এসেছি, এটা আপনি জানলেন কি করে? আর আপনি আমার ফোন নম্বরই বা পেলেন কোথা থেকে ?”
“আপনি বৃজ তানওয়ারের গেস্ট হয়ে এসেছেন ? কিছুক্ষণ আগে আপনাদেরকে দেখলাম আলওয়ার প্যালেসে । আর ফোন নম্বর? ওটা পেয়েছি আমার জয়পুরের হোটেল থেকে । মনে আছে ট্রেনেতে আপনার ফোন ইঊজ করলাম ।”
“তা প্যালেসে দেখলেন যখন, কথা বললেন না কেন তখন?” আমিও ছেড়ে দেওয়ার পাত্র নই । “আর আপনি যে আলওয়ারে আসবেন, সে কথা তো বলেননি ।“
গনেশ সিং অস্ফুটস্বরে কি বললেন বোঝা গেল না । ফোনটা দেখলাম কেটে গেল । আবার হয়ত ফোন করবেন ভেবে অপেক্ষা করে রইলাম, কিন্তু ফোন আর এল না ।
ফিরে এসে দেখলাম টেবিলে থালি দিয়ে গিয়েছে । মেথি বাজরার রুটি, ভাত আর আচার থালাতে, ছোট ছোট বাটিতে নানারকম সব্জী সেই থালাকে ঘিরে । আমাকে দেখে তানওয়ার তাড়াতাড়ি কথা শেষ করে ফোনটাকে টেবিলে নামিয়ে রাখলেন । এতক্ষণ উনি এখানকার আঞ্চলিক ভাষা মেওয়াতীতেই কথা বলছিলেন । আমাকে দেখে আবার দিল্লীর হিন্দিতে ফিরে গেলেন ।
“আপ কঁহা থে ? এ লোগ তুরন্ত খানা লাগা দিয়া ।”
আমি বাক্যব্যয় না করে থালি সদ্ব্যবহারে মনযোগ করলাম । তানওয়ারও আমার দেখাদেখি হাত লাগালেন । মেথি বাজরার রুটি কাড়ির বাটিতে ডোবাতে ডোবাতে বললেন, “হিঁয়াকা সবসে বড়িয়া সব্জী হ্যায় গাট্টে কা, ইসি কো মৎ ছোড়না ।” ভদ্রলোকের প্রসারিত তর্জনী অনুসরণ করে গাট্টে কা সব্জীর টুকরো বাটি থেকে মুখে তুলে দুপুরের প্ল্যানটা জানতে চাইলাম ।
তানওয়ার গম্ভীরমুখে আমাকে যা বোঝালেন তা হল আগের প্ল্যানমাফিক আলওয়ার ঘোরা হচ্ছে না, অন্তত এই মুহূর্তে । ওনাকে আবার আলওয়ার প্যালেসে ফিরে যেতে হবে, পারমিট সংক্রান্ত ব্যাপারে । ওনার সহকারী সেই আর্টিস্টও আসবেন সেখানে । আশা করছেন যে খুব তাড়াতাড়ি ওই মামলার নিস্পত্তি করতে পারবেন ।
বৃজ তানওয়ারের কথানুযায়ী লাঞ্চ শেষ করে আমরা আলওয়ার প্যালেসে ফিরে গেলাম । আর্টিস্ট সহকারীটি তখনও এসে পৌঁছননি । প্যালেসের ভিতরের বাকী দ্রষ্টব্যগুলো দেখার এই সুযোগ । তানওয়ারের আগের বর্ণনা অনুযায়ী দ্রষ্টব্যের মধ্যে মহম্মদ ঘোরী, আকবর আর আওরংজেবের ব্যবহৃত তরোয়াল রয়েছে । বাক্যব্যয় না করে আমি প্রাসাদের গর্ভে হারিয়ে গেলাম । ঘোরাঘুরি শেষ করতে প্রায় মিনিট পঁয়তাল্লিশ কাটল । গণেশ সিং কি এখনও প্যালেসের আশপাশে রয়েছেন । মোবাইলটা বার করে ফোন করব কিনা ভাবছি, হঠাৎ তানওয়ারের গলা ভেসে এল, “মিস্টার মুন্সী, ইধার আ জাইয়ে । হমারা কাম খতম হো চুকা ।”
আর তাঁর সহকারীটি বা কোথায় । জিজ্ঞাসা করতেই উনি কারপার্কিং এর দিকে নির্দেশ করে বললেন, “রাণী কো আভি জয়পুর কে লিয়ে রওয়ানা হোনা পড়া হ্যয় ।” দেখলাম সুবেশা এক মহিলা লাল রঙের ল্যাণ্ড রোভারে চালকের আসনে উঠছেন । মুখের যেটুকু অংশ দেখতে পেলাম, তাতে মনে হল কোথায় যেন ওনাকে দেখেছি ।
তানওয়ারকে এবেলা একটু আশ্বস্ত মনে হল । হয়ত ওনার পারমিটের ঝামেলাটার মিটমাট হয়ে গিয়েছে । আমি কালবিলম্ব না করে আলওয়ারের বাকি দ্রষ্টব্যগুলো দেখতে যাওয়ার কথাটা পেড়ে ফেললাম । ভদ্রলোক এবারে আর কোন আপত্তি করলেন না । আলওয়ার ঘুরে সূর্য ডোবার মুখে সিলিসেরহ লেকের ধারে পৌঁছলাম । আরাবল্লী পাহাড়ের ওপর বাল কেল্লা তখন অস্তরবির সোনালী আলোজ্জ্বল
“হমে অব জয়পুর কে লিয়ে রওয়ানা হোনা হ্যায়,” তানওয়ারকে এবারে একটু অধৈর্য ঠেকল । গাড়ী যখন জয়পুর অভিমুখে হাইওয়েতে উঠল, ঈশানকোণে তখন মেঘ জমতে শুরু করেছে । একবার বিদ্যুৎও চমকাল বলে মনে হল । তানওয়ারের মতে বৃষ্টি শুরু হলেও বেশিক্ষণ চলবে না, অকালবৃষ্টির এটাই নিয়ম ।
আলওয়াছাড়ার আধঘন্টার মধ্যে চেপে বৃষ্টি এল । ইনোভার ওয়াইপার সড়াৎ সড়াৎ করে চলছে । তানওয়ার তারই মধ্যে কাঁচের ফাঁক দিয়ে রাস্তার দিকে সজাগ দৃষ্টি রেখে স্টিয়ারিং হুইল ধরে রেখেছেন । এই অবস্থায় কি ভদ্রলোককে কথাটা বলা ঠিক হবে? একটু দোনামনা করে জিজ্ঞাসা করে ফেললাম, “হিঁয়াসে ভানগড় কিতনা দূর হ্যায়?” তানওয়ার এমনভাবে আমার দিকে তাকালেন যে মনে হল নিতান্ত আহাম্মক না হলে এই পরিস্থিতিতে এমন প্রসঙ্গ কেউ তোলে না । তাও ভদ্রতার খাতিরে বললেন, “জাদা দূর নহি হ্যায়, লেকিন হমে দুসরি সড়ক সে যানা হোগা ।”
তানওয়ার কথাটা শেষ করেছেন কি প্রচন্ড বেগে ব্রেক কষতে করতে হল । সিট বেল্ট বাঁধা থাকা সত্ত্বেও সেই ঝাঁকুনিতে গাড়ীর ড্যাশবোর্ডে মাথাটা প্রায় ঠোকা লেগে যাচ্ছিল । একটু ধাতস্থ হতে দেখি একটা ট্রাক আরেকটা ট্রাকের ভিতরে ঢুকে গিয়েছে আর তাদের ওপর এক বিশাল গাছ পড়ে আছে । বৃষ্টির জন্যেই কিনা জানিনা, আশেপাশে একটা জনপ্রাণী চোখে পড়লনা । তানওয়ার গম্ভীরমুখে বললেন, “ইয়ে পিপল কা পেড় হ্যায় । ইসে হঠানা মুশকিল হোগা । আভি তো দুসরি সড়ক সে জানাই হোগা ।”
ভদ্রলোক নিপু হাতে স্টিয়ারিং ধরে গাড়ীটাকে প্রায় একশ মিটার রিভার্সে চালালেন । তারপর গাড়ী ঘুরিয়ে হাইওয়ের উল্টোদিকে চলে এলেন । আলওয়ারের দিকে খানিক এগোতেই বাঁহাতে একটা রাস্তা এল যার মুখে দেখলাম একটা সাইনবোর্ড লাগান – সরিস্কা ন্যাশানাল পার্ক। হাইওয়ে ছেড়ে সেই রাস্তায় উঠতে উঠতে তানওয়ার মন্তব্য করলেন, “লিজিয়ে, এহি হ্যায় ভানগড় জানেকা সড়ক ।এত অল্প সময়ের মধ্য যে আমাদের যাত্রাপথ এভাবে বদলে যাবে তা ভাবতে পারিনি ।
সরিস্কা ন্যাশানাল পার্কের একাংশের মধ্যে দিয়ে রাস্তা চলে গিয়েছে । দুপাশে ঢোক, অর্জুন, আরো নানারকম গাছগাছালিতে ভরা জঙ্গল । এককালে মহারাজাদের মৃগয়ার জায়গা ছিল এই বন । এখন ব্যাঘ্রপ্রকল্পের কল্যাণে বাঘেদের পুনর্বাসন ঘটছে । ইদানীং প্রায় কুড়ির কাছাকাছি হয়েছে রয়াল বেঙ্গল টাইগারদের সংখ্যা । তানওয়ারের ধারাবিবরণীতে সব জানতে পারলাম ।
ভদ্রলোকের কথাই ঠিক । জঙ্গল থেকে বার হওয়ার পরই দেখি বৃষ্টি বন্ধ । তবে রাত্রি পুরোপুরি নেমে এসেছে, গাড়ীর হেডলাইট রাস্তার দুধারে গাছের গুঁড়িতে লাগান রঙে রিফ্লেক্ট করে অন্ধকারের গভীরতাকে বুঝিয়ে দেয় । আরো কিছুক্ষণ চলার পর দেখি আকাশের মেঘ কাটছে
রাত আটটা নাগাদ ভানগড় পৌঁছলাম । আকাশে তখন দ্বাদশীর চাঁদ উঁকি দিচ্ছে মেঘের আড়াল থেকে
তানওয়ার নিজের থেকেই রাস্তার ধারে গাড়ি দাঁড় করালেন । কাঁচা রাস্তা নেমে গিয়েছে ভানগড় দুর্গের দিকে । দূরে আরাবল্লীর রেঞ্জ চাঁদের আলোয় উদ্ভাসিত । ওরই কোলে দুর্গ । তানওয়ারের হিসাবে প্রায় দু’ কিলোমিটার পথ দুর্গের গেট । “রাত কি টাইম ভূত বাংলা মে জানা মনা হ্যায়,” আমাকে উদ্দেশ্য করে ভদ্রলোক সতর্কবাণী দিলেন । গণেশ সিংও দুর্গ-পরিচিতি দিতে গিয়ে ভৌতিক পটভূমিকার কথা বলেছিলেন ।
“লেকিন কভি কভি স্পেশাল পারমিট মিল জাতী হ্যায় ।” এরই জন্যে কি আলওয়ার থেকে পরিশ্রম করে পারমিট নিলেন ?  ইস্‌ আগে জানলে ভদ্রলোককে ধরে একটা ব্যবস্থা হয়ত করা যেতে পারত । উনি বোধহয় আমার নিরাশার ভাব দেখে একটু সদয় হলেন । “চলিয়ে, মেন গেট তক্‌ হাম জা সকতে হ্যায় ।”
সড়ক ছেড়ে দুর্গে যাওয়ার রাস্তা ধরলেন তানওয়ারহয়ত সাবধানতার কথা ভেবেই গাড়ীর হেডলাইট নিভিয়ে দিলেন । চাঁদের আলোয় আশপাশের পরিবেশ আরও মায়াবী হয়ে উঠল । ভাঙ্গাচোরা রাস্তা দিয়ে ইনোভা ঝাঁকুনি খেতে খেতে এগোতে থাকে । মিনিট দশেক এইভাবে চলার পর আমরা পার্কিংয়ের জায়গায় এসে পৌঁছলাম । সামনেই হনুমান মন্দির । দুর্গ আরো দশ মিনিটের হাঁটাপথ । কিন্তু এর পরে আর যাওয়া যাবে না ।
অগত্যা গাড়ী থেকে নেমে আমি পায়ে হেঁটে আশপাশ দেখতে থাকি । চাঁদের আলোয় দুর্গটা না জানি কি অপরূপ রূপ নিয়েছে । না দেখতে পাওয়ার আফসোসটা থেকে গেল । পকেট থেকে ফোন বার করে সেলফি তোলার প্রচেষ্টা নিই । এ ব্যাপারটা ঠিক করায়ত্ত হয়নি । দিল্লীতে সমরের মেয়ে দেখিয়ে দেয়অনেক কষ্টে ভল্যুমের বোতামটা টিপতে শিখেছি  দুর্গে যাওয়ার রাস্তাকে পিছনে রেখে সেই মতো এবারেও আঙ্গুল যথাস্থানে রাখতেই হাত আটকে গেল ।
ফোনের স্ক্রীনে ফুটে উঠেছে একজোড়া হেডলাইট, দুর্গের রাস্তা দিয়ে একটা গাড়ী তীর গতিতে আমার দিকে ছুটে আসছে । একলাফে রাস্তা থেকে সরে এলাম । হতভম্ব হয়ে পিছনে ঘুরতেই দেখি সব শুনশান, অন্ধকারের মধ্যে মিলিয়ে গেছে দুর্গে যাওয়ার পথ । তানওয়ার কোথায়? ইনোভার কাছে এসে দেখলাম গাড়ীতে কেউ নেই । যে পথে এসেছি তাও জনশূন্য, অন্ততঃ যতদূর চোখ যায় । আচমকা একটা ভয় আমাকে গ্রাস করল । ঠিক করলাম গাড়ীর ভিতরে গিয়ে বসব । তানওয়ার হয়ত প্রাকৃতিক কারণের জন্য কোন আড়ালে আশ্রয় নিয়েছেন, আমার মনে হল আমারও যাওয়া দরকার । কিন্তু একি, গাড়ীর দরজা তো বন্ধ !
খানিকক্ষণ গাড়ীর বাইরে দাঁড়িয়ে রইলাম । হয়ত তানওয়ার চলে আসবেন । কিছুক্ষণ পরে দেখি অবসাদে পা ধরে আসছে । আর তো অপেক্ষা করা যায়না । একটু এগিয়েই দেখা যাক, যদি উনি চোখে পড়ে যান । একশো গজ মত এগোতেই হনুমান মন্দিরে ওঠার জায়গা পেলাম ।  পাথরের বেড়ার ওপর দিয়ে সোজা চাতালে উঠে দুর্গের রাস্তাটাকে ভাল করে নিরীক্ষণ করতে থাকি । নাহ্‌, না কোথাও তানওয়ার, না কোন গাড়ী । শুধু চাঁদের আলোয় উদ্ভাসিত ভানগড় দুর্গ আর আশেপাশের বনরাজি । এমন দৃশ্য ক্যামেরাবন্দী না করে থাকা যায় !
এবারে আর সেলফি নয় । ফোনটাকে সামনে তাক করে ভানগড় দুর্গকে ফ্রেমে ধরলাম । বোতাম টিপতেই যে ছবিটা ধরা পড়ল তা পুরো অন্ধকারের । মোবাইল ফোনের ক্যামেরা দিয়ে রাতের বেলা ছবি তোলার এই এক অসুবিধে । কিন্তু সামনে যা দেখছি তাকে তো উপেক্ষা করা যায় না । হয়ত আর একটু এগিয়ে চেষ্টা করলে ছবিটা উঠতে পারে । কিন্তু হনুমান মন্দিরের চৌহদ্দি পার হওয়া মানে তো দুর্গের এলাকার মধ্যে প্রবেশ করা । তানওয়ার বার বার নিষেধ করে দিয়েছেন । এদিকে চাঁদের আলো মেখে দুর্গটা যেন অদৃশ্য হাতছানি দিয়ে ডাকছে ।
মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে পায়ে পায়ে হনুমান মন্দিরের চাতাল থেকে নেমে দুর্গের পথ ধরলাম । পাথর ফেলা রাস্তায় সাবধানে পা ফেলে এগোতে থাকি । দু-একবার ঠোক্করও খেলাম । মিনিট পাঁচেক মতো হাঁটার পর থামলাম । পিছন ফিরে দেখলাম কেউ আমায় লক্ষ্য করছে কিনা । চরাচরে কোন প্রাণের চিহ্ন নেই, কেবল জায়গায় জায়গায় জমাট অন্ধকার বেঁধে আর তার ফাঁকে ফাঁকে চাঁদের আলো লুকিয়ে আছে । আর এগোনটা হয়ত ঠিক হবেনা । একটা বড় দম নিয়ে আবার ক্যামেরা তাক করলাম, নিশ্বাস বন্ধ করে বোতাম ধরে থাকলাম পাছে হাত কেঁপে যায় । একসঙ্গে অনেকগুলো ছবি উঠল বুঝলাম । নতুন প্রযুক্তির দান এই হাই ডাইনামিক রেঞ্জ ফোটোগ্রাফি । এবারে নিশ্চয়ই ভাল ছবি উঠেছে । কিন্তু কোথায় কি, সেই পুঞ্জীভূত অন্ধকার ছবির ফ্রেমে । রোখ চেপে গেল, এগিয়ে চললাম দুর্গের দিকে ।
আর একটু গিয়ে যে জায়গাটায় এসে পড়লাম, সেটা একটা বাগানের মতো । অনেকটা ফাঁকা মাঠ, চারপাশে গাছগাছালি । এখান থেকে ডানদিক ধরে দুর্গের দিকে রাস্তা উঠে গিয়েছে । সেই পথে পা বাড়ালাম । রাস্তাটার ঢাল যেখান থেকে উঁচু হয়ে উঠেছে, সেখানে দাঁড়াতে দুর্গটা বেশ ভাল নজরে এল । এখান থেকে ছবি তোলার একবার শেষ প্রচেষ্টা নেব ।

লেন্সের ভিতর দিয়ে যে ছবি ধরা পড়ল, তাতে নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারলাম না । দুর্গের খিলানের তলায় দাঁড়িয়ে খোলা চুলে এক রমণী, প্রসারিত দু’হাত তার । ভয়ে ভয়ে লেন্সটা জুম করতে হৃদপিণ্ডটা লাফিয়ে উঠল । কলকাতা থেকে আসার পথে ট্রেনে যে স্বপ্ন দেখেছিলাম, সেই স্বপ্নে দেখা সুন্দরীর মতো এর ভঙ্গী । কিন্তু মুখটা স্পষ্ট বোঝা গেল না । তন্দ্রাহত হয়ে তাকিয়ে থাকতে থাকতে দেখি স্ক্রীনে আরও একটা অবয়ব ফুটে উঠেছে । পাগড়ি মাথায় ঝোলা পোষাক পরা একজন লোক টের পিঠে চড়ে এগিয়ে চলেছে দুর্গের দিকে । আমার স্বপ্নে দেখা এই লোক তো ছিলাম আমি !
কতক্ষণ ওই দৃশ্য দেখছিলাম জানিনা, সম্বিত ফিরল গাড়ীর চাকা ঘষার আওয়াজে । ক্যামেরা হাতে করে কখন যেন রাস্তার ঠিক মাঝখানটাতে এসে দাঁড়িয়েছি । লেন্সের ভিতর দিয়ে দেখি রাস্তার ঢাল ধরে একটা গাড়ী আমার দিকে নেমে আসছে । এবারে স্পষ্ট দেখলাম লাল রঙের ল্যান্ড রোভার । চালকের আসনে এক সুবেশা মহিলা, তার চুল উড়ছে হাওয়ায় ।  আশ্চর্য, তার ঠিক পিছনে দুর্গের খিলানের নিচে যেখানে কিছুক্ষণ আগে অন্য এক রমণী দাঁড়িয়ে ছিল, সে জায়গাটা ফাঁকা । আমার নড়ার কোন ক্ষমতা নেই, পা দুটো পাথর হয়ে গিয়েছে ।  অবিশ্বাস্য হয়ে দেখলাম টের পিঠ থেকে লোকটাকে কেউ যেন টেনে ফেলে দিল, ঠিক যেমনটা স্বপ্নে দেখেছিলাম । আর সেই মুহূর্তে আমাকেও কেউ যেন ঠেলে সরিয়ে দিল রাস্তার মাঝখান থেকে ।
ভারসাম্য হারিয়ে পড়তেই, হাত থেকে ফোনটা ছিটকে গেল । সামনে ভেসে উঠল চাঁদের আলোয় ঢাকা নির্জন পথ, এঁকেবেঁকে উঠে গিয়েছে দুর্গের দিকে । পড়ে যেতে যেতে মনে হল কানের পাশ দিয়ে শোঁ করে হাওয়া বয়ে গেল, সেই হাওয়াতে যেন পেট্রলের গন্ধও পেলাম । মাথাটা মাটিতে ঠুকতেই জ্ঞান হারালাম ।
যখন চোখ মেললাম, তখন দিনের আলো । আমার ওপর যে মুখটা ঝুঁকে আছে সেটা খুব চেনা – গণেশ সিং । মাথার কাছটা ভিজে লাগাতে হাত দিয়ে বুঝলাম জল ঢালা হয়েছে, হুঁশ ফেরানোর জন্য । বুক পকেটে হাত দিয়ে দেখলাম ফোনটা রয়েছে, হয়ত গণেশই খুঁজে দিয়েছেন । গণেশ সঙ্গে জনা দুয়েক লোক নিয়ে এসেছেন । একজন উর্দিপরা, বোধহয় এখানকার সিকিউরিটি হবে । ভয়ে ভয়ে ওদের সাহায্য নিয়ে উঠে দাঁড়ালাম । ডান কাঁধের ব্যথাটা আবার চাগাড় দিয়ে উঠল । দেখলাম সামনে একটা জীপ খাড়া রয়েছে । তাতে উঠিয়ে আমাকে ভানগড় পুলিশ স্টেশনে নিয়ে আসা হল ।
আগের রাত্রের বিস্তারিত বিবরণ দিলাম পুলিশকে । ভাবলাম বুঝি আইন অমান্য করে রাতের বেলায় দুর্গ এলাকায় ঢুকেছিলাম বলে জরিমানা দিতে হবে । দেখলাম সেসব কিছু বললনা । যেটা বলল, সেটার জন্য একেবারেই প্রস্তুত ছিলাম না । আমাকে যেখানে পাওয়া গিয়েছে তার দশ ফুট দূরেই নাকি বৃজ তানওয়ারের মৃতদেহ পড়েছিল । দেহের ক্ষত দেখে মনে হয়েছে কোন বড় পাথরে পিষে গিয়েছেন । কিন্তু আশেপাশে সেরকম বড় কোন পাথরের সন্ধান পাওয়া যায়নি । আর না, ল্যান্ড রোভারের মতো কোন ভারী গাড়ীর চাকার দাগ প্রবেশদ্বার থেকে শুরু করে আমাকে খুঁজে পাওয়া গিয়েছিল যেখানে সেই জায়গা পর্যন্ত চোখে পড়েনি ।
গণেশ সিংয়ের গাড়ীতে জয়পুর ফিরলাম । বৃজ তানওয়ারের গাড়ীর ব্যবস্থা পুলিশই করবে জানা গেল । আমার জিনিসপত্রে ভরা সমরের ব্যাগটা পরে উদ্ধার করতে হবে পুলিশের জিম্মা থেকে । পথে আসতে আসতে গণেশ যা বললেন, তা অত্যাশ্চর্য বললে কমই বলা হয় । ভানগড়ের প্রথম রাজা মাধো সিংয়ের অষ্টাদশী কন্যা রত্নাবতীর রূপে মুগ্ধ হয় সিন্ধিয়া নামে এক যাদুকর । রত্নাবতী যাতে তার প্রতি আকৃষ্ট হয়, এর জন্য সে এক জড়িবুটি তেলের শিশি রত্নাবতীর এক দাসীর হাত দিয়ে চুপিসারে পাঠায় । তেলের গুণাবলীর কথা ফাঁস হয়ে গেলে, শিশিটাকে এক পাথরের ওপর আছড়ে ভেঙ্গে ফেলা হয় । রত্নাবতীর পরিবর্তে তখন সেই পাথর যাদুকরে আকৃষ্ট হয়ে তাকে ধাওয়া করে এবং যাদুকরকে পিষে মেরে ফেলে । মৃত্যুপথযাত্রী সিন্ধিয়া অভিশাপ দেয় যে রত্নাবতী বা ভানগড় দুর্গের যে কোন বাসিন্দাকে সে পরপার থেকে হত্যা করবে । ভানগড় দুর্গের এই কাহিনী প্রবল জনশ্রুত । গণেশ সিংয়ের জন্ম আলওয়ারে, ছোটবেলায় এই গল্প বহুবার শুনেছেন । ন’বছর বয়সে কলকাতা অভিমুখী হন বাবার ইছাপুর অরডিন্যান্স ফ্যাকট্রির কর্মসূত্রে । পরবর্তীকালে ছুটিছাটাতে আলওয়ারে আসতেন । তাই এই অঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগটা থেকেই যায় । ট্রেনে যে অলৌকিক গল্প আমাকে বলতে শুরু করেছিলেন তাও তিনি শুনে থাকেন আলওয়ারের সঙ্গে দীর্ঘ যোগসূত্রের মাধ্যমে । দূর আরাবল্লী পর্বতমালার দিকে চোখ রেখে যখন সেই কাহিনীর সারমর্ম বললেন, বিস্ময়ে আমার মুখ হাঁ হয়ে গেল । আমার স্বপ্নে দেখা ছবি সঙ্গে তার হুবহু মিল । অথচ ওনার সেই বইয়ের পাতা আমার উলটে দেখা হয়নি । সূদূর বাংলাদেশের এক সন্তান কি ভাবে রাজস্থানের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ল, তা ওই গল্পে রয়েছে ।
বৃজ তানওয়ার ও তাঁর সহকারিণী রাণী সিংকে গনেশ পারিবারিক সূত্রে চিনতেন । তাঁরা আলওয়ারের দুই প্রসিদ্ধ্ব পরিবারের অন্তর্গত । কিন্তু ওই দুই পরিবারের মধ্যে সদ্ভাব ছিলনা । তার কারণও ঐতিহাসিক – ভানগড় দুর্গের বিচিত্র ইতিহাসের সঙ্গে তা জড়িয়ে । তানওয়াররা  নাকি যাদুকর সিন্ধিয়ার বংশোদ্ভূত, রাণীরা মাধো সিংয়ের ! শোনা যায় ওঁদের মধ্যে প্রগাঢ় বন্ধুত্ব ছিল, কিন্তু পারিবারিক কারণে একে অপরের জীবনসাথী হতে পারেননি । রাজস্থানের এইসব অঞ্চলে পারিবারিক লেনদেনের শিকড় অনেক গভীরে রয়ে গিয়েছে ।
বছর আটেক আগে গণেশ যখন পূজোর পর এই সময়টায় জয়পুরে আসেন, তখন এক ঘটনা ঘটে । কলকাতা থেকে বেড়াতে আসা একটি বছর ত্রিশেক বয়েস ভদ্রলোকের রহস্যজনক মৃত্যু ঘটে ওই ভানগড় দুর্গে । দুর্গে ওঠার সিঁড়ির মুখে তাঁর দেহ পাওয়া যায় । পুলিশ মনে করে সিঁড়ির ওপর থেকে ওনাকে কেউ ঠেলে ফেলে দিয়েছিল । যারা ভানগড় দুর্গে আসে, তাদের অধিকাংশ এই এলাকার বাইরের । তাও পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদ করেছিল । কেউ বলে উনি একলাই ঘুরছিলেন, আবার কেউ নাকি ওনাকে এক মহিলার সঙ্গে ঘুরতে দেখেছিল । জয়পুরের এক হোটেলে উঠেছিলেন, তবে ভানগড়ে কি ভাবে এসেছিলেন তা পুলিশে উদ্ধার করতে পারেনি । কলকাতার লোক বলে গণেশের এই কেসটাতে কৌতূহল হয় । ছুটি কাটাতে এসে উনি নিজেই তদন্ত শুরু করে দেন ।
দুর্ঘটনার দিন ভদ্রলোক হোটেলে ব্রেকফাস্ট করেন, কিন্তু লাঞ্চের অর্ডার দিয়েও খেতে আসেননি । অর্থাৎ বেলার দিকে উনি হোটেল থেকে বার হন । হতে পারে যে উনি লাঞ্চে এমন কারুর সঙ্গে দেখা করেছিলেন, যিনি ওনাকে ভানগড়ে নিয়ে আসেন । দেওয়ালীর আগ দিয়ে জয়পুরে এত ভীড় হয় যে দোকানে দোকানে ঘুরে তথ্য জোগাড় করাটা সময়ের অপচয় । গণেতাই সোজা ভানগড় চলে আসেন । তবে দুর্গের দিকে না গিয়ে উনি বড়রাস্তার আশপাশে খোঁজ নিতে থাকেন । দুর্গে যাওয়ার রাস্তার মুখে একটা শাকাহারী রেস্টুরেন্ট আছে, সেটা আমিও লক্ষ্য করেছিলাম । আট বছর আগে ওটা আকারে আরো ছোট ছিল । সেই সময় ওখানে কাজ করত এমন একটি ছেলে যে ওনাকে জানায় ওই দিন বিকেলের দিকে রেস্টুরেন্টের পিছনের জঙ্গলে ময়লা ফেলতে সে এসেছিল । তখন দেখেছিল একজন লোক একটা সাদা রঙের গাড়ী থেকে নেমে বড়রাস্তা পার হয়ে একটা লাল রঙের গাড়ীতে উঠল আর গাড়ীটা দুর্গের দিকে চলে গেল । দৃশ্যটা দেখে তার খটকা লাগলেও কাউকে সে জানায়নি । ভারতবর্ষের অন্যান্য জায়গার মতো রাজস্থানেও বেশীর ভাগ গাড়ীর রং সাদা । সে যাত্রায় ণেশের তদন্ত বেশীদূর এগোয়নি
এর দু’বছর বাদে গণেশ আবার ছুটিতে জয়পুর আসেন । ততদিনে সেই দুর্ঘটনার কথা চাপা পড়ে গিয়েছে । জয়পুরের জহুরী বাজারে বৃজ তানওয়ারের সঙ্গে দেখা, সেই সাথে রাণী সিংও । পুরনো দিনের অনেক কথা হল । তানওয়ার তাঁর ব্যবসার কথা জানালেন । জহুরী বাজারে কিউরিওর দোকান মূলত দিল্লীর দোকানের মাল সাপ্লাই দেওয়ার জন্য খোলা হয়েছে, ইত্যাদি । যেতে গিয়ে যেটা গণেশের চোখে পড়ল, সেটা হল একটা সাদা আর একটা লাল গাড়ী কিউরিওর দোকানের সামনে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে
গণেশ আলওয়ারে এলেন পুরনো তদন্ত পুনরুত্থান করতে । আলওয়ার প্যালেসে সরকারী দপ্তরখানার কর্মী এক বন্ধুর মাধ্যমে জানলেন বৃজ তানওয়ার ইদানীং প্রতি অক্টোবরে চাঁদনী রাতে ভানগড় দুর্গ প্রবেশের পারমিট নিচ্ছেন । দিল্লী থেকে বিদেশী পর্যটকদের ট্যুর করাতে নিয়ে আসেন । নিশ্চয়ই মোটা টাকা দিয়ে থাকে পর্যটকেরা যে কারণে পারমিট ইস্যু হচ্ছে । ওই বন্ধুই কথাচ্ছলে “অভিশপ্ত গড়”-এর প্রাক্‌কাহিনী বলেন গণেশকে ।
শোনা যায় যে নয় দশক আগে আলওয়ারের রাজা যে বঙ্গসন্তানকে তাঁর কোষাগারে মুহুরী হিসাবে নিযুক্ত করেন, তিনি ভানগড় দুর্গের প্রবাদকে হাতেনাহাতে যাচাই করতে একলাই এক অমাবস্যার রাতে দুর্গে উপস্থিত হন । ভানগড় দুর্গ সে সময় পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে ছিল । ফলে মানুষজন বিশেষ যাতায়াত করত না । দিনকয়েক বাদে দুটি ছেলে ছাগল চরাতে গিয়ে সেই বঙ্গসন্তানকে একপ্রকার উন্মাদ অবস্থায় দুর্গের এক গোপন কক্ষ থেকে উদ্ধার করে । রাজামশাই ইংরেজ চিকিৎসকদের দিয়ে তাঁর প্রিয় মুহুরীর সেবাযত্ন করান । দীর্ঘদিন চিকিৎসার পর মুহুরী আরোগ্যলাভ করেন এবং তাঁর ভানগড়ের অভিজ্ঞতা কাহিনী আকারে লেখেন । তাই এতদিন বাদে “অভিশপ্ত গড়”-শীর্ষক গল্পে সেই কাহিনী খুঁজে পেয়ে গণেশ চমৎকৃত হন ।
“কিন্তু বৃজ আর রাণীর সঙ্গে সে কাহিনীর কি যোগাযোগ,” কৌতূহল সম্বরণ না করতে পেরে আমি গণেশকে জেরা করে বসি ।
“সেটা না হয় আপনি গল্পটা পড়েই দেখুন,” এই বলে স্মিত হেসে গণে   শ আমাকে পাল্টা প্রস্তাব দিয়ে বসেন । মোট কথা পরবর্তীকালে ছুটিতে এসে উনি বৃজ আর রাণীর ওপর নজর রাখতেন, বিশেষতঃ যদি কোন বাঙ্গালী তাঁদের মধ্যে গিয়ে পড়েন ।
“সে তো বুঝলাম, কিন্তু শুধুমাত্র ছুটিতে কেন? বছরের বাকী দিনগুলোয় কি করতেন,” আমার নিজের গলার জোর শুনে নিজেই তাজ্জব হয়ে গেলাম ।
“তার উত্তরও ওই গল্পে পাবেন,” আবার গণেশ ওকালতির চাল চাললেন ।
“তবে তো বইটা অবশ্যই আপনার কাছ থেকে ধার করতে হচ্ছে । কিন্তু আপনি আমাকে কিভাবে ফলো করলেন ? আমার তো রাজস্থানে আসার কোন প্ল্যান ছিল না,” আমি উৎসাহ দেখাতে পিছপা হলাম না ।
“আমার আলওয়ারের বন্ধুটি জানায় যে অমুক দিন বৃজ তানওয়ার আসবেন পারমিট নিতে । সেই শুনে আমি আমার সাময়িক গোয়েন্দাগিরি শুরু করে দিলাম । আমি আপনাদের আগেই পৌঁছে গিয়াছিলাম আলওয়ার প্যালেসে । তবে আপনাকে দেখামাত্র আমি ছায়ার মতো আপনার সঙ্গে ঘুরেছি । সামনাসামনি আসিনি, আড়ালেই থেকেছি । কেবল ভানগড় দুর্গে পৌঁছতে একটু দেরী করে ফেলেছিলাম । তাই আপনাকে এতটা ভুগতে হলো ।”
জয়পুরে গণেশ তাঁর হোটেলেই আমার থাকার বন্দোবস্ত করে দিলেন । পূর্বপরিকল্পনা মতো সার্কিটহাউসে থাকাটা হলো না এইযাত্রায় । গণেশ উৎসাহভরে জয়পুর শহরটা ঘুরিয়ে দেখালেন । জহুরী বাজারে তানওয়ারের কিউরিও শপটা দেখাতেও ভুললেন না । পরদিন ভুতুড়ে গল্পের সংকলন বইটা হাতে দিয়ে দিল্লীগামী রাজস্থান পরিবহণ নিগমের বাসে তুলে দিলেন । বেলা একটা নাগাদ দিল্লী পৌঁছলাম । সমরকে জয়পুর থেকে ফোনেই পরিবর্তিত পরিস্থিতি সম্পর্কে অবগত করে দিয়েছিলাম । দিল্লীতে এসে ওই একই কথা পুনরাবৃত্তি করলাম, কোনো বিশদ ব্যাখার মধ্যে গেলাম না । ভানগড় পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করে ব্যাগের ব্যবস্থা করবে বলে সমর আশ্বাস দিল । সেইদিন রাতে কলকাতার ট্রেনে উঠে তবে শান্তি ।
কয়েক ঘন্টা চলার পর চারিদিক যখন শান্ত হয়ে এসেছে, তখন বাঙ্কে উঠে বালিশে মাথা রেখে গায়ে দেওয়ার চাদরটা নাক অবধি টেনে নিয়ে বই খুললাম । সূচীপত্র ধরে একে একে নামতে থাকলাম । নাহ্‌, “অভিশপ্ত গড়” বলে লেখা তো চোখে পড়ল না । তবে পৃষ্টা ছাপ্পান্ন আর পঁয়ষ্টটির মধ্যে কোন পাতা নেই, পাতা ছেঁড়া হয়েছে বলে মনেও হল না । গণেশ কি তবে ভুল বই দিলেন, কিন্তু এই মলাটই তো দেখেছিলাম আসার পথে । আর আমার স্বপ্ন, তার প্রতিচ্ছবি এল কি করে সেই গল্পে । ছবি বলতে মনে পড়ল ফোনের কথা । সে রাতে ছবি তোলার যে প্রচেষ্টা নিয়ে ছিলাম, তা তো ব্যর্থ হয়েছিলতাও ফোন খুলে ছবি ঘাঁটতে ঘাঁটতে এলাম সেই সময়টাতে । দেখি পর পর দুটো ফ্রেম, একটাতে একটু আবছা হলেও দুর্গটা বোঝা যাচ্ছে আর অন্যটাতে প্রযুক্তির কল্যাণে পরিষ্কার ছবিতাহলে –

বাইরে জ্যোৎস্নালোকিত প্রান্তরের মধ্যে তখন ট্রেন ছুটে চলেছে তার গন্তব্যের দিকে ।

প্রিন্সটন, নিউ জার্সি
২২শে মার্চ, ২০১৯ 

আলোয় ফেরা

প্রতি বছর সময়ের কাঁটা মিলিয়ে এই বৈশাখ মাসে আমার নিউ জার্সির ঘর-গেরস্থালির আশপাশ ঘিরে প্রকৃতি অপরূপ সাজে সেজে ওঠে । কোথায় “দারুণ অগ্নিবা ...