Sunday, April 14, 2019

হালখাতা

সকালের আমেজটা নিয়ে বন্ধ দোকানের সামনে এসে দাঁড়ালেন নিবারণ । গঙ্গাস্নান সেরে বাড়ীতে গৃহদেবতার পায়ে মাথা ঠেকিয়ে বেরিয়েছেন । বেরোবার সময় স্ত্রী সরমা নতুন পাঞ্জাবির পকেটে পূজোর ফুল দিয়ে বললেন, “বছরটা আমাদের ভাল কাটুক ।”

অ্যাসিস্টেন্ট পলাশ শাটারে টান দিয়ে দোকান খুলতেই নিবারণ কপালে হাত ঠেকিয়ে ভিতরে ঢুকলেন । দোকানের বড় ঘড়িতে তখন আটটা বেজেছে । কালীঘাটের এই অ্যাপ্লায়েন্সের শোরুমটায় বিপণন শুরু হতে এখনও ঘন্টাখানেক দেরী । তবে এই ‘হালখাতা’র দিনে নিবারণের বন্ধুবান্ধব-শুভানুধ্যায়ীরা একটু আগে থেকেই ভীড় করবেন । ড্রাইভার স্বপনকে শ্রীহরির দোকানে পাঠিয়ে দিয়েছেন কচুরি আর নিমকির অর্ডারের খোঁজ নিতে । মিষ্টি আসবে ভীমনাগের দোকান থেকে । আজ বহু বছর ধরে এই প্রথা চলে আসছে ।

শোরুমটা বছর পনেরো হলো হয়েছে । কলকাতা জুড়ে শপিং মল হওয়ার হিড়িক লাগতেই নিবারণ তাঁর ষাট বছরের স্যুটকেস-বেডিংয়ের দোকান উঠিয়ে দিয়ে ব্যাঙ্ক লোন নিয়ে শোরুমটা চালু করেন । মধ্যবিত্ত বাঙ্গালী আজকাল আকাশপথে উড়ে বেড়ায়, তাই তাদের স্যুটকেস-বেডিংয়ের প্রয়োজন ফুরিয়েছে । বরং ঘরের কাজ করার সময়ের অভাব, তাই অ্যাপ্লায়েন্সের চাহিদা বেড়েছে । ফলে আট বছরের মধ্যেই নিবারণ ব্যাঙ্ক লোন শোধ করে দিতে পেরেছেন ।

“স্যার, আপনার চা,” করিতকর্মা পলাশ ধূমায়িত কাপ আর সেই সঙ্গে দুটো ব্রিটানিয়া গুডডে বিস্কুট এনে রাখল নিবারণের সামনে । সকালে সরমা এক গ্লাস লেবুর শরবৎ তাঁকে বানিয়ে দিয়েছিলেন । হালখাতার খাওয়া-দাওয়া থাকবে বলে আর কিছু খাননি । 

“সজল তো এখনও এলো নারে, তুই একা দোকান সামলাতে পারবি তো,” চায়ে বিস্কুট ডোবাতে-ডোবাতে পলাশকে প্রশ্ন করেন নিবারণ, “আমাকে আবার খাওয়াদাওয়ার দিকটা দেখতে হবে আজ ।

“সে আপনি চিন্তা করবেন না । আজ সকালে বেশী কাস্টমার আসবে না । সব এখন ইন্ডিয়া-অস্ট্রেলিয়ার ওয়ান-ডে দেখছে এই ছুটির দিনে, নিবারণকে আশ্বস্ত করে পলাশ ।

সত্যি, বাঙ্গালীর হুজুগের অন্ত নেই । কলকাতায় এই নববর্ষ উদ্‌যাপন আজ প্রায় এক উৎসবে পরিণত হয়েছে । আগে ছিল চৈত্রের সেল, এখন টিভিতে একমাস ধরে বিজ্ঞাপন চলে নববর্ষ উপলক্ষ্যে কোথায় কি সেল চলবে ।  ওপার বাংলায় তো বর্ষবরণ এখন একটা জাতীয় উৎসব ।

‘ওপার’ বলতে বহুদিন আগের কথা মন পড়ল । নিবারণের খুব ছোটবেলাটা কেটেছে ময়মনসিংহে । তখন জ্যাঠতুতো-খুড়তুতো ভাইবোনদের সঙ্গে টাউনের হাতগুণতি কয়েকটা দোকানে ঘুরলে হালখাতায় বাতাসা বা নিদেনপক্ষে গজা মিলত । তারপর এল দেশভাগ আর সেইসঙ্গে দাঙ্গা । রাতারাতি গ্রামের জমিজিরাত-ঘরবাড়ী প্রায় জলের দরে বেচে দিয়ে তাঁদের জ্ঞাতিগুষ্টি উদ্বাস্তু হয়ে শিলচরে এসে আশ্রয় নিলেন ।

গ্রামের মাস্টার নিবারণের বাবা সাতজনের সংসারের অন্নসংস্থান করতে মুদির দোকান দিলেন । সেখানে হালখাতা বা নববর্ষ  উদ্‌যাপনের সুযোগ বা সঙ্গতি কোনটাই ছিলনা । সেই সময় বেশ কিছু বছর নববর্ষ কোথা দিয়ে আসত-যেত তার খেয়াল নিবারণ রাখেননি ।

যে বছর ম্যাট্রিক দেবেন সে বছর কাছাড় গণসংগ্রাম পরিষদের ডাকে সারা বরাক উপত্যকা উত্তাল হয়ে উঠল – রাজ্য সরকারের অসম ভাষাকে রাজ্যব্যাপী একমাত্র ভাষা হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়ার বিরুদ্ধে । শিলচর তথা বরাক উপত্যকাতে তখন লক্ষাধিক বাঙ্গালী রয়েছেন যাঁদের অধিকাংশ উদ্বাস্তু । নিবারণদের পরিবার ততদিনে একটু স্বচ্ছলতার মুখ দেখতে শুরু করেছে । মুদির দোকানের পরিবর্তে শিলচর শহরে এক বস্ত্রবিপণীর মালিক হয়েছেন তাঁরা

নতুন দোকানের প্রথম হালখাতা অনুষ্ঠান হবে, নিবারণের বাবা তাই নববর্ষের বেশ কিছুদিন আগে থেকেই তার প্রস্তুতিতে ব্যস্ত । অন্যদিকে নিবারণের জ্যাঠতুতো দাদা-দিদিরা গণসংগ্রাম পরিষদের স্বেচ্ছাসেবক হয়ে শিলচর-জুড়ে পিকেটিং করছেন । নিবারণের বাবার তাতে সম্মতি থাকলেও বাড়ীর বড় ছেলে নিবারণকে আসন্ন ম্যাট্রিক পরীক্ষার কথা বারবার মনে করিয়ে দিতেন । চৈত্র সংক্রান্তির দিন বিকেলে খবর এল এবারের নববর্ষের সূচনা হবে সত্যাগ্রহ দিয়ে – কাছাড় গণসংগ্রাম পরিষদ দিনটিকে ‘সঙ্কল্প দিবস’ বলে ঘোষণা করেছে ।

নববর্ষের দিন সকাল-সকাল নিবারণ বাবার সঙ্গে দোকানে পৌঁছে গেলেন, সঙ্গে আরো দুই ভাই-বোন । বেরোবার সময় জ্যাঠতুতো দাদারা সাবধান করে দিলেন যে গণ্ডগোল হতে পারে, সেই বুঝে যেন দোকান খোলা হয় । হালখাতার আয়োজন এক অনিশ্চিয়তার মধ্যে শুরু হল । ভাই-বোনদের নিয়ে নিবারণ কয়েকটা চাঁদোয়ার মালা দোকানের ভিতরে নানাদিকে ঝুলিয়ে দিলেন । নিবারণের বাবা জলখাবারের জোগাড়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন, এরমধ্যে একফাঁকে হালখাতার পূজোটা তাঁকে দিয়ে আসতে হবে ।

সকাল দশটা অবধি দু’একজন নিত্যখদ্দের আর পাড়া-প্রতিবেশী ছাড়া দোকানে কারুর পদাপর্ণ ঘটল না । চারিদিকে একটা থমথমে অবস্থা । আরো বেলার দিকে খবর এল তারাপুর স্টেশনে সত্যাগ্রহীদের ওপর অসম পুলিশ লাঠিচার্জ করেছে । খবরটা যেন বিদ্যুৎগতিতে ছড়িয়ে পড়ল । দোকানে বসে নিবারণ দেখলেন প্রায় পঞ্চাশ-ষাট জনের মতো ছেলেমেয়ে শিলচর পুলিশ স্টেশন ঘেরাও করবে দৌড়তে দৌড়তে চলেছে ।

“কিরে মিলু, তুই চুপচাপ বসে থাকবি নাকি? আয় আমাদের সঙ্গে আয়”, নিবারণ দেখলেন তাঁর সহপাঠিনী কমলা তাঁকে রাস্তা থেকে ডাকছে । কমলারা তাঁদের মতোই উদ্বাস্তু হয়ে এসেছিল, তবে সিলেট থেকে । কমলাদের পরিবার তখনও অভাব-অনটনের মধ্যে দিয়ে চলেছে । বেশ কয়েকবার নিবারণ তাকে পড়ার বইও ধার দিয়েছেন ।

“নারে, বাবা রাগারাগি করবেন । যে কোন সময়ে চলে আসবেন, পূজো দিতে গিয়েছেন,” নিবারণ কমলাকে নিরস্ত করার চেষ্টা করেন ।

“আমি মাস্টারমশাইকে বুঝিয়ে বলব । এখন তুই আয় আমাদের সঙ্গে,” কমলা প্রায় জোর করেই নিবারণকে দোকান থেকে টেনে বার করে । নিবারণের বাবা কমলা ও তাঁর সহপাঠীদের প্রায়শই সংস্কৃত পড়ায় সাহায্য করেন । সেইসূত্রে সহপাঠীরা নিবারণের বাবাকে ‘মাস্টারমশাই’ বলে ।

ভাইবোনদের মুখে আশংকার ছায়া দেখে নিবারণ দোনামোনা করতে থাকেন । ততক্ষণে ভীড়ের মধ্যে থেকে তাঁর ক্লাসের আরো কিছু ছেলেমেয়ে এসে নিবারণকে প্রায় কাঁধে তুলে নিয়ে এগোতে শুরু করে । পুলিশ যেন বিক্ষোভকারীদের জন্য প্রস্তুত ছিল । বাজারটা পেরোতেই কাঁদানে গ্যাসের চার্জ আরম্ভ হল । নিবারণ এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন কখনও হননি । মুহূর্তের মধ্যে জটলা ছত্রাকার হয়ে পড়ল । দিকভ্রান্ত হয়ে নিবারণও দৌড়লেন, চোখ জ্বলছে তাই দিক ঠাওর করতে পারলেন না । হঠাৎ হাতটা কে যেন চেপে ধরল, দেখলেন কমলা ।

“আমি জানতাম কাঁদানে গ্যাস চলবে, তাই এটা সঙ্গে করে এনেছিলাম,” কমলা তার হাতে ধরা কাপড়ের টুকরোটা নিবারণকে দেখায় । “চার্জ শুরু হতেই চোখে বেঁধে নিই । এখন চল, তোর একটা ব্যবস্থা করি । তোকে আবার দোকানে ফিরতে হবে তো ।”
কমলার সহায়তায় নিবারণ চোখমুখ ধুয়ে ঘন্টাখানেক বাদে দোকানে ফিরলেন । বলাবাহুল্য অনেক কঠিন জেরার মুখোমুখি হতে হল বাবার কাছে, যদিও পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার অনেক চেষ্টাই কমলা করেছিল । নিবারণের বাবা আর ঝুঁকি না নিয়ে দোকান বন্ধ করে ছেলেমেয়েদের নিয়ে বাড়ীর দিকে রওনা দিলেন ।

পরের একমাস নিবারণের স্কুল-আর-বাড়ী ছাড়া অন্য কোথাও যাওয়ার অনুমতি মিলল না । বরাক উপত্যকায় উত্তেজনা তখন তুঙ্গে উঠেছে ।  ম্যাট্রিক পরীক্ষা যেদিন শেষ হল, তার পরের দিনই শিলচর স্টেশনে পিকেটিং বসল । ওদিকে যতদিন না ম্যাট্রিকের ফলাফল বেরাচ্ছে, ততদিন নিবারণকে দোকানেই থাকতে হবে – এই মতো সিদ্ধান্ত নিলেন নিবারণের বাবা ।

পরের শুক্রবার, ১৯শে মে – দিনটা এখনও নিবারণের স্মৃতিতে জ্বলন্ত হয়ে আছে – সকাল-থেকে-সন্ধ্যা হরতালের ডাক দিল গণসংগ্রাম পরিষদ । নিবারণদের দোকানের ঝাঁপ বন্ধ থাকল, আর নিবারণ রইলেন বাড়ীতে আটকা পড়ে । দুপুরে খবর এল শিলচর স্টেশনে পুলিশ সত্যাগ্রহীদের ওপর গুলি চালিয়েছে, মারা গেছেন বেশ কিছু মানুষ আর আহত হয়েছেন অনেকে । বিকেলের দিকে জ্যাঠতুতো দাদাদিদিরা যারা পিকেটিং করতে গিয়েছিলেন তাঁদের মুখে নিবারণ জানতে পারলেন যে নিহতদের মধ্যে রয়েছে কমলাও । খবর পেয়ে বাড়ীতে কাউকে না জানিয়ে নিবারণ সোজা হাসপাতালের দিকে রওয়ানা দিলেন । কোথায় একটা অপরাধবোধ যেন তাঁকে তাড়িয়ে নিয়ে চলল । হাসপাতালে তখন জনারণ্য, সারা শিলচর যেন ভেঙ্গে পড়েছে । বেডেতে কমলা যেন এক মুখ প্রশান্তি নিয়ে ঘুমিয়ে আছে , পাশে তার শোকস্তব্ধ পরিবার । মাথার কাছের টেবিলে সেই কাপড়ের টুকরোটা – চোখের জলের বদলে রক্তে ভেজা ।

সেইদিনের পর নিবারণের জীবন অন্যখাতে বইল । কলকাতায় চলে এলেন কলেজে পড়তে । মায়ের এক মেসোমশাই যিনি কিনা প্রথম বিশ্বযুদ্ধে মেসোপটেমিয়ায় ছিলেন নজরুলের সঙ্গে, তাঁর বাক্স-বেডিংয়ের দোকানের তদারকি শুরু করলেন । নিঃসন্তান সেই মাসী-মেসো নিবারণকে খুব কাছের করে নিলেন ও তাঁদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি সব তাঁকেই লিখে দিলেন ।

“বাবা তোমার পূজো দেওয়া হয়ে গিয়েছে”, ফোনে বড় ছেলে কমলের গলা পেলেন, “আমরা আর একটুক্ষণের মধ্যে পৌঁছে যাচ্ছি ।”

“স্যার, সজল এসে গিয়েছে, আমরা ওদিকটা দেখছি,” শ্যামলের আশ্বাসবাণীও কানে এল ।

“স্যার, কচুরী আর মিষ্টি কি এখনই প্যাকেট করে দেব,” স্বপন এক ঝাঁকা-মুটে নিয়ে দোকানে ঢুকতে ঢুকতে জিজ্ঞাসা করে, “আমাকে আবার এখন বাড়ী গিয়ে বৌদিকে নিয়ে নিউ মার্কেট যেতে হবে, কমলদা বলে দিলেন ।”

Hi দাদু, এখন busy হওনি দেখছি,” ষোল বছরের নাতনী কাজল হৈ হৈ করে এসে পড়ল, “আজকে কিন্তু তাড়াতাড়ি শোরুম close করতে হবে । আমরা আজ lunch করতে যাব সপ্তপদীতে, বাবা reservation করে দিল ।” বাবা অর্থাৎ কমল, ছোটছেলে শোভন সপরিবারে থাইল্যান্ড বেড়াতে গিয়েছে ।

বরাক আন্দোলনের অর্ধশতাব্দীতে ষোল বছরের কমলার স্মৃতিতে শিলচরের স্কুল-প্রাঙ্গণে তার এক আবক্ষমূর্তি স্থাপন করা হয় – ভাষা-শহীদদের মধ্যে একমাত্র মেয়ে সে । নিবারণ সেই প্রচেষ্টায় আর্থিক সাহায্য করে থাকেন । পূজোর ফুল ছুঁইয়ে যে লাল খেরোর খাতা কমল নিয়ে আসছে, তা নিবারণ সিন্দুকে তুলে রাখবেন । ব্যবসার হিসেবনিকেশ এখন সব কম্পিঊটারেই হয় ।


প্রিন্সটন, নিউ জার্সি
১৪ই এপ্রিল, ২০১৯
(চৈত্র সংক্রান্তি, ১৪২৫)

No comments:

Post a Comment

আলোয় ফেরা

প্রতি বছর সময়ের কাঁটা মিলিয়ে এই বৈশাখ মাসে আমার নিউ জার্সির ঘর-গেরস্থালির আশপাশ ঘিরে প্রকৃতি অপরূপ সাজে সেজে ওঠে । কোথায় “দারুণ অগ্নিবা ...