প্রতি বছর সময়ের
কাঁটা মিলিয়ে এই বৈশাখ মাসে আমার নিউ জার্সির ঘর-গেরস্থালির
আশপাশ ঘিরে প্রকৃতি অপরূপ সাজে সেজে ওঠে । কোথায় “দারুণ অগ্নিবাণেরে, হৃদয় তৃষায় হানেরে...” মতন পরিস্থিতি হবে তা নয়, এ যেন “মনে মনে রচি
মম ফাল্গুনী”র এক নিরবিচ্ছিন্ন অবকাশ । পৃথিবীর অন্যপ্রান্তে, শহর কলকাতায়, ঠিক একই
সময়ে পিচ-গলানো আগুনের হল্কা ছুটছে, ফাঁকে-ফাঁকে হয়ত চলছে কালবৈশাখীর
আনাগোণা । নববর্ষ দিয়ে যে মাসের প্রারম্ভ, অচিরেই তা পঁচিশে এসে পৌঁছয় । আর প্রতি
বছরের মতই এক অন্তর্যাত্রার পথে পা বাড়াই । কবে কোথায় শুরু এই নিয়ম করে বেনিয়মী
পথচলা তা সঠিক মনে নেই ।
শৈশব-কৈশোরের দিনগুলোর
অনেকটাই ভরে থাকত রবীন্দ্রচর্চায় – মধ্যবিত্ত বাঙ্গালী পরিবারে বইয়ের আলমারীতে
সযত্নে রক্ষিত রবীন্দ্র-রচনাবলীর পাতা ওলটানো থেকে আকাশবাণী হতে সম্প্রচারিত রবীন্দ্রসঙ্গীত শোনা – যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে উত্তরোত্তর বেড়েছিল
। স্কুলের অনুষ্ঠান থেকে পূজো প্যাণ্ডেলের অনুষ্ঠান – সুযোগ পেলেই “বহু যুগের ওপার
হতে” কবিতা, গান, নাটক ভেসে আসত এক কিশোরের রোমান্টিকতাকে ভরিয়ে তুলতে । আরও একটু
বয়সকালে, পঁচিশে বৈশাখ মানেই ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে রবীন্দ্রসদন অভিমুখে যাত্রা
করা ।
রবীন্দ্রয়াণের
ফলস্বরুপ শিখলাম অনেক কিছুই – এমন কিছু যা সেই মহান চিন্তাধারার
সঙ্গে নিবিড় পরিচয় করিয়ে দেয় । তবে সেই চেনাটা রয়ে গেল যা কিছু নিয়মানুসারে গঠিত –
কবিতা, গান, স্বরলিপি, গল্প-উপন্যাস, গীতিনাট্য, ইত্যাদি – সেই সবের মধ্যে । অথচ এই
কাঠামো তো তাঁরই তৈরী, পাছে ভবিষ্যকাল তাঁর এই সৃষ্টিসম্ভারকে ভুল ব্যাখা করে । বয়স
বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মনের মধ্যে একটা কৌতূহল থেকেই গেল – সেই মহান চিন্তাধারার
উৎস কি বা কোথায় ?
ব্যক্তিত্বের পরিচয় পাওয়া
মানেই যে ব্যক্তির সঙ্গে পরিচয় তা তো নয় । এই উপলব্ধিটা প্রাসঙ্গিক হল আরও
অনেকগুলো বছর পরে । একবিংশ শতাব্দীর প্রায় গোড়ার দিকে, নিউ জার্সির কিছু
নাট্যমনস্ক মানুষ বন্ধুবর গৌতম দত্তের উৎসাহে স্থির করলেন প্রখ্যাত সাহিত্যিক সুনীল
গঙ্গোপাধ্যায়ের কালজয়ী উপন্যাস “প্রথম আলো” মঞ্চস্থ করবেন । গৌতম খসড়া করলেন
নাটকের পাণ্ডুলিপি । নাটকের বাড়তি আকর্ষণ হল সুনীলদা ও তাঁর স্ত্রী স্বাতী গঙ্গোপাধ্যায়কে
যথাক্রমে রাজা বীরচন্দ্রমাণিক্য ও রাণী ভানুমতীর ভূমিকায় পাওয়া । নিউ জার্সি ছাড়াও অন্যান্য কয়েকটি রাজ্যে নাটকটি
মঞ্চস্থ করার ব্যবস্থা গৌতম করে ফেললেন । নাটকের বেশ কিছু চরিত্রের জন্য
অভিনেতা-অভিনেত্রী বাছাই করা হয়ে গেলেও একটি বিশেষ চরিত্র তখনও ফাঁকা পড়ে –
রবীন্দ্রনাথ ।
যতদূর জানতাম ওর আগে রবীন্দ্রনাথকে মঞ্চে বা রূপালী পর্দায় কখনও চরিত্রায়ণ করা হয়নি । তাই
পরিচালক গৌতম বা অন্যদের কাছে কোন উল্লেখযোগ্য
দৃষ্টান্ত ছিল না যে ঠিক কি ভাবে তাঁর চরিত্রকে মঞ্চস্থ করা যেতে পারে এবং সে
দায়িত্ব কার ওপর ন্যস্ত হবে । নাটকের পাণ্ডুলিপি অনুসারে চরিত্রের মুখে সংলাপ ছাড়াও
থাকবে কবিতা ও গান । চরিত্রায়ণের সব থেকে কঠিন
দিক হল বয়ঃসীমা – রবীন্দ্রনাথের আঠারো
থেকে বিয়াল্লিশ বছর উপস্থাপিত হবে এই নাটকে । প্রথমে ঠিক করা
হল পাণ্ডুলিপিতে কিছু রদবদল ঘটিয়ে দু’জনকে
দিয়ে নাটকের দুই অঙ্কে অভিনয় করানো হবে । অডিশনে সেইমত ব্যবস্থা নেওয়া
হল, এবং সেখানে আমিও ছিলাম । ক’দিন বাদে গৌতমের ফোন এল – সুনীলদা এবং অন্যান্যদের
সঙ্গে আলোচনা করে উনি এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে রবীন্দ্রনাথের ভূমিকায় একজনই অভিনয়
করবেন এবং সে দায়িত্ব আমাকেই দেওয়া হচ্ছে ।
অভিনয়ের অভিজ্ঞতা
থাকলেও ঐতিহাসিক বা এই ধরণের বিশেষ চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ আগে কখনও আসেনি । আর রবীন্দ্রনাথ
তো বিশেষের মধ্যেও বিশিষ্ট । প্রায় প্রতিটি বাঙ্গালীর মানসে তাঁর এক স্বকীয় স্থান,
আমিও তার ব্যতিক্রম নই । সেই অতিসম্ভ্রমের জায়গা থেকে চরিত্রটিকে বাস্তব করে তোলা যে
সহজ হবে না তার আভাস দিলাম গৌতমকে । তবে আমি আমার যথাসাধ্য চেষ্টা যে করব সে
প্রতিশ্রুতিও দিলাম ।
রবীন্দ্রনাথের
বিস্তৃত রচনাসম্ভার, সাদাকালো ছবি আর চলচ্চিত্রে পরিণত বয়সের আবছায়া মূর্তি – এই হল
চরিত্রায়ণের পুঁজি । বলা বাহুল্য চল্লিশোর্ধে অতি-পরিণত অভিনেতার পক্ষে আঠারোর তারুণ্যকে
বাস্তবায়িত করা কষ্টকর, সেখানে তো আমি নিতান্তই অপটু । সব থেকে দুরূহ হয়ে দাঁড়াল
সেই দৃশ্য যেখানে বিংশবর্ষীয় কবি রচনা করছেন “নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ” । সেই মুহূর্তে আমার সীমাবদ্ধ সৃজনশীলতা এক অন্তরায় হয়ে উঠল ।
মানুষ মাত্রেই
প্রকৃতির নিবিড় সান্নিধ্য উপভোগ করে । রবীন্দ্রনাথের ক্ষেত্রে এই সম্পর্ক এক বিশেষ
মাত্রা নিয়েছে । প্রকৃতির নানা রূপ-রস-গন্ধ-বর্ণ তাঁর অন্তরকে এক মহাজাগতিক অনুভূতিতে
ভরিয়ে তোলে । যখন অন্তরাত্মার এই অনুভূতি তাঁর আত্মাকে স্পর্শ করে, তখন এক গভীর
অস্থিরতায় তাঁর আত্মা ভরে ওঠে । ফল্গুধারার
মতো বহতা অশান্ত চিত্ত বহির্জগতে তার মুক্তি খোঁজে – স্বপ্নভঙ্গ হয়ে নির্ঝরের
জাগরণ – দৃশ্যটির ক্রিয়া-কেন্দ্র এইটাই ।
|
|
“প্রথম আলো” নাটকের
একটি দৃশ্য – কাদম্বরী ও রবীন্দ্রনাথ
|
বহু প্রচেষ্টার ফলস্বরুপ
ব্যর্থতা ছাড়া আর কিছু এলো না । এদিকে নাটক মঞ্চস্থ করার দিনও এগিয়ে আসছে । অবশেষে
স্থির করলাম যে পাণ্ডুলিপির বাইরে চরিত্র আর অভিনেতার মধ্যে এক মেলবন্ধনের বিশেষ
প্রয়োজন । কবির অন্তরে যে বহির্জগতের সঙ্গে এক “নিগূঢ় আত্মীয়তা” ঘটেছে, অভিনেতাকেও
সেইরকম অন্তর্যাত্রায় গিয়ে মহাজগতের সঙ্গে আত্মীয়তা গড়ে তুলতে হবে । “নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ” কবিতার টীকা, ওই বিশেষ ক্ষণের
পর্যালোচনা রবীন্দ্রনাথের নিজের কলমে, এবং সুনীলদার বিষয়টি নিয়ে অভিমত – কোন কিছুই
বাদ দিলাম না ।
একটি তাৎপর্যপূর্ণ দিনে, অপরাহ্ণ
ও বিকেল মিলিয়ে “নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ” রচনা করা হয় । এই সৃষ্টিকে
কবি যে আখ্যা দিয়েছেন “আমার সমস্ত কাব্যের
ভূমিকা” বলে তার কারণ শুধুমাত্র এর স্বকীয়তাই নয়, এর উৎসের প্রতিভাসটিও
কম তাৎপর্যপূর্ণ নয় । এ বিষয়ে “জীবনস্মৃতি”তে রবীন্দ্রনাথ
লিখেছেন –
“সদর স্ট্রীটের
রাস্তাটা যেখানে গিয়া শেষ হইয়াছে সেইখানে বোধকরি ফ্রি-স্কুলের বাগানের গাছ দেখা
যায় । একদিন সকালে বারান্দায় দাঁড়াইয়া আমি সেইদিকে চাহিলাম । তখন সেই গাছগুলির পল্লবান্তরাল
হইতে সূর্যোদয় হইতেছিল । চাহিয়া থাকিতে থাকিতে হঠাৎ এক মুহূর্তের মধ্যে আমার চোখের
উপর হইতে যেন একটা পর্দা সরিয়া গেল । দেখিলাম, একটি অপরূপ মহিমায় বিশ্বসংসার
সমাচ্ছন্ন, আনন্দে এবং সৌন্দর্যে সর্বত্রই তরঙ্গিত । আমার হৃদয়ে স্তরে স্তরে যে-একটা
বিষাদের আচ্ছাদন ছিল তাহা এক নিমেষেই ভেদ করিয়া আমার সমস্ত ভিতরটাতে বিশ্বের আলোক
একেবারে বিচ্ছুরিত হইয়া পড়িল । সেইদিনই ‘নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ’ কবিতাটি নির্ঝরের মতোই
যেন উৎসারিত হইয়া বহিয়া চলিল ।”
তিনি আরও লিখেছেন – “লেখা
শেষ হইয়া গেল, কিন্তু জগতের সেই আনন্দরূপের উপর যবনিকা পড়িয়া গেল না । এমনি হইল
আমার কাছে তখন কেহই এবং কিছুই অপ্রিয় রহিল না ।” রবীন্দ্রনাথের শৈশব-কৈশোর-যৌবনে নানা
উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটেছে । কিন্তু এই বিশেষ অনুভুতির কথা রবীন্দ্রনাথ বহুবার, নানা
পরিস্থিতিতে বলে গিয়েছেন পরবর্তী জীবনে ।
দৃশ্যটিতে
রবীন্দ্রনাথ ছাড়াও রয়েছেন কাদম্বরী, কবির “নতুন বৌঠান” । দশ নম্বর সদর স্ট্রীটের বাড়ীতে
কবি তখন রয়েছেন তাঁর প্রিয় জ্যোতিদাদা ও নতুন বৌঠানের সঙ্গে । কাদম্বরী ও
রবীন্দ্রনাথ, দু’জনাই সেইসময় সাময়িক অসুস্থতা কাটিয়ে উঠছেন । সুতরাং দৃশ্যটিতে তাঁরা
একপ্রকার “নবজীবন” লাভ করছেন ওই কবিতা সৃষ্টির মুহূর্তটিতে । ওই সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের
চরিত্রটি এক ঘোরের মধ্যে পড়ে প্রায় বিকারগ্রস্ত অবস্থায় “আচ্ছাদন ভেদ” করার চেষ্টা
করছে, যে রবীন্দ্রনাথ বারংবার এইভাবে প্রাত্যহিকতার বেড়াজাল সরিয়ে অনিত্যকে খুঁজেছেন
। সেই অনিত্যের ছোঁয়া পাওয়ামাত্র চরিত্রটি এক অনীর্বচনীয় আনন্দে ভরে ওঠে
এবং সেই মুহূর্তে উৎসারিত হয় সমস্ত ভাব ও শব্দ যা দিয়ে গাঁথা হয় “নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ”।
নাটকের
প্রদর্শনীতে এই দৃশ্যটি দর্শকদের মনে বিশেষ দাগ কাটে । গভীর আবেগ ও
নাটকীয়তার মাঝামাঝি একটা সূক্ষ রেখা ধরে এর উপস্থাপনা সহজসাধ্য ছিল না । অভিনয়ের
সামান্য তারতম্যে দৃশ্যটিতে অতিনাটকীয়তা ঘটে
যাওয়ার সুযোগ ছিল যথেষ্টই । নাটকের প্রদর্শনীর
ফাঁকে সুনীলদার অভিমত জানতে চাই – ওনার কল্পনার রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে উপস্থাপিত চরিত্রটির
কতখানি সাযুজ্য রয়েছে, চরিত্রায়ণ বাস্তব হয়েছে কিনা, ইত্যাদি । তাঁর
মতে, যেখানে আমরা প্রত্যেকে রবীন্দ্রনাথকে “আপন মনের মাধুরী মিশায়ে” রচনা করে
চলেছি, সেখানে যে এক এক জন তাঁকে এক এক ভাবে উপস্থাপন করবে, সেটাই স্বাভাবিক ।
“প্রথম আলো” মঞ্চায়ণ হয়েছিল
প্রায় দু’দশক আগে । আজও পঁচিশে বৈশাখে ভাবতে বিস্মিত হই, সেই কোন যুগের প্রভাতে এক
তরুণের “হিয়ার মাঝে” লুকিয়ে থাকা আমার আমি বহির্বিশ্বের সঙ্গে প্রবল
উচ্ছ্বাসে মিলন ঘটিয়ে “কি গান গাহিল রে” যা দু’শতক বাদেও একই ভাবে আমাদের হৃদয়ে প্রতিধ্বনিত হতে থাকবে –
“আজি এ প্রভাতে রবির কর
কেমনে পশিল প্রাণের পর,
কেমনে পশিল গুহার আঁধারে
প্রভাতপাখির গান!
না জানি কেন রে এত দিন পরে
জাগিয়া উঠিল প্রাণ।
জাগিয়া উঠেছে প্রাণ,
ওরে উথলি উঠেছে বারি,
ওরে প্রাণের বাসনা প্রাণের
আবেগ রুধিয়া রাখিতে নারি।”
-
প্রিন্সটন, নিউ জার্সি
১৭ই মে, ২০১৯
