ইস্টার্ন বাইপাসের
ধারে জলা জায়গাটা ঘিরে হাঁসেদের জটলা । এদিকে তেমন ঘরবাড়ী নেই, তাই বর্ষার ঢল
নামতেই নানা পাখীর দল ভিড় করেছে এই সাতসকালে । দূরে বাইপাসে দু-একটা গাড়ী
মাঝেমধ্যে হুসহাস করে চলে যাচ্ছে । হাঁসেদের উচ্চস্বরে ডাকাডাকি আর কোলাব্যাঙের
ঘ্যাঙরঘ্যাঙ সেই যান্ত্রিক শব্দকে ছাড়িয়ে ঐক্যতান সৃষ্টি করেছে ।
ফড়িংগুলো এক
শালুকের রেণু মেখে অন্য শালুকের কাছে ভিড় করতে ব্যস্ত । জলের ধার ঘেঁসে বক
ধ্যানমগ্ন হয়ে সেই দৃশ্য দ্যাখে । বর্ষার টইটুম্বুর জলায় মাছের চারারা দ্বিগুণ
উৎসাহে দাপাদাপি করছে । তাতে বকের কোন ভ্রুক্ষেপ নেই । মনে হয় পৃথিবী রসাতলে গেলেও
তার ধ্যান ভাঙবে না । এ যেন কৈলাসে অধিষ্ঠিত দেবাদিদেব মহাদেব ।
আকাশপানে ছড়িয়ে
থাকা শাপলার পাপড়িতে এক ফোঁটা বৃষ্টি পড়ল । শালুকের ডাঁটা বেয়ে উঠতে থাকা শামুকের
দল থমকে গেল । আবার মেঘের পর্দার আড়ালে মুখ লুকল সূর্য । তবুও বকের পৃথিবীতে তার কোন ছায়া
পড়ে না । কেউ জানেনা সে কি ভাবছে, কিংবা আদও সে কিছু ভাবছে কিনা ।
“ঝপাং” শব্দে জলার
অতিথিরা চমকে উঠল । ক্রমশঃ
বিস্তৃত হতে থাকা ঢেউ এসে ছুঁল খাড়া হয়ে থাকা বকের পায়ে । হঠাৎ ধ্যান ভেঙ্গে দু’ডানার সাহায্যে সে উড়ল আকাশে । “ব্যাটা বক ধার্মিক” – দাঁত বের করে এক চোট হাসল মাদল । পিঠে স্কুলের
বইখাতা ভর্তি ব্যাগ, দুই
হাতে নুড়িপাথর । ঠাকুমার কাছে
মহাভারতের গল্পটা সে শুনেছে । ধর্মরাজের মতো বকটাও কি কাউকে প্রশ্ন করার জন্যে
অপেক্ষা করে আছে । সেটা পরীক্ষা করতেই তার হাতের নুড়ি স্থানচ্যুত হয়ে পড়েছে ।
বক জলাটাকে ঘিরে
ওপরে উঠতে থাকে । আবার জলে এসে পড়ে মাদলের নুড়ি । এবারে হাঁসের দল ভয় পেয়ে আওয়াজ করতে করতে উঁচু পাড়ের দিকে
রওয়ানা দিল । সেই দেখে বক
আরও দু’ চক্কোর মেরে বট গাছের উঁচু ডালের ওপর এসে বসল
। মাদল চেষ্টা
করে হাতের নুড়িটাকে তাক করে বকের দিকে ছুঁড়তে, কিন্তু নিশানার ধারেকাছে পৌঁছয় না । অগত্যা বিফল মনে কালিকাপুরের ষষ্ঠ শ্রেণীর ছাত্র স্কুলের পথে
পা বাড়ায় ।
মাদল চোখের আড়াল
হতেই উচ্চাসন ছেড়ে সাবলীল ভঙ্গীমায় ডানা বিস্তার করে বক আবার জলের ধারে তার আগের
জায়গাটিতে এসে স্থিত হয় । কলকাতার পুকুর-ডোবাগুলো একে একে ভরাট হয়ে যাচ্ছে । বককে
তাই অনেকটা পথ উড়ে আসতে হয় এই জলার ধারটুকুর নিরবচ্ছিন্ন আশ্রয়ের জন্য । তার
যাতায়াতের পথ এই অস্থির শহরটার উপরের আকাশটাকে চিরে যায় ।
আজই তো ভোরে প্রথম
আলোর ঝলকানিতে তার বাসা ছেড়ে পূবমুখে উড়ে যেতে যেতে ময়দানের গাছগাছালির মাঝে একটু
থামার প্রচেষ্টা নিয়েছিল । সেখানেও “দুম্”
আওয়াজে জিরোন বন্ধ রেখে আবার সে ওড়া শুরু করে । সবুজ ঘাসের
ওপর পড়ে থাকা এক যুবকের নিথর শরীরের ওপর তার ছায়া পড়েছিল কিনা জানা নেই ।
চঞ্ছু ডুবিয়ে বক বেশ অনেকখানি জল টেনে নিল । বর্ষার কল্যাণে শালুক-শাপলার গুটি
ভেসে উঠেছে । তাদেরই একটা একটা করে গলাধকরণ করে গা পরিষ্কারে মন দিল । অনেকক্ষণ
ধরে সাফসুতরো করে আবার চোখ বুজে সে ধ্যানস্থ হল ।
অঙ্কের ক্লাসে ভয়েভয়ে খাতা খুলে বসল মাদল । মাস্টারমশাই বোর্ডেতে চক দিয়ে একের পর এক লসাগু-গসাগুর
দুর্বোধ্য আঁক কষে চলেছেন – এই বুঝি ছাত্রদের মুখোমুখি হয়ে বলবেন বাকীটা শেষ করতে । না পারলে হয়
বেতের বাড়ি, নয়তো কান ধরে বেঞ্চির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা । এমন বাদলার
দিনে কি আকাশের ভ্রুকুটি ছেড়ে অঙ্কের মাস্টারের চোখ রাঙ্গানি দেখতে ইচ্ছে করে ।
অনিচ্ছাসহকারে তালিমারা স্কুলের ব্যাগ থেকে মাদল তার কড়ে আঙ্গুলের সমান একটা
পেন্সিল বার করে । জিভেতে
পেন্সিলের ডগাটা ছুঁইয়ে সে বোর্ডেতে লেখা আঁকগুলোর নকলনবীশীর প্রচেষ্টা নেয় । পেন্সিলের ডগাটা ভোঁতা হয়ে এসেছে, একটু চাপ দিতেই “মট” আওয়াজে বোঝা গেল আর
অগ্রসর হওয়া যাবেনা । আর লেখা
থামলেই তা অবশ্যম্ভাবীরূপে মাস্টারমশায়ের
চোখে পড়বে ।
মাথা নিচু করে মাদল লেখার ভান করে । খিদেটা বেশ চাগিয়ে ঊঠেছে । সকালে এক থালা
পান্তাভাত খেয়ে স্কুলে এসেছে, আবার বিকেলে ফিরে মুড়ি খাবে । এর মাঝে আর কোন খাওয়া
নেই । বাড়ন্ত বয়সে খিদেটা বাগ মানেনা । পঞ্চম শ্রেণী অবধি স্কুলে খাওয়া দিত, এখন
তার পাট চুকে গেছে । তবে আজ বাবা এক বড় ভোজের জায়গায় গিয়েছে । বিশ্বনাথ ইদানীং
কেটারিং সংস্থায় বেয়ারার কাজ করছে । তাই আজকাল মাদলদের বাড়ী বাড়তি খাবার আসে ।
আজ বাবা কি আনবে –
গতসপ্তাহে বেশ বড় সাইজের হিঙ্গের কচুরী আর ছোলার ডাল এনেছিল, আর গতমাসে ভেজিটেবল
চপ । তবে মাছ-মাংস আসে না, ওসব নাকি বাড়তি হয় না । হাতের পেন্সিলটা হঠাৎ হাত থেকে
বেরিয়ে ঠকাস করে মাটিতে পড়ে গেল । পরিবর্তে দুই আঙ্গুলের ফাঁকে যেটা দেখা দিল সেটা
বোধহয় এই মুহূর্তে আশাপ্রদ নয় – অঙ্ক মাস্টারের বেত ।
“কিরে মাদল, আজ বুঝি
অঙ্কে মন নেই । তা খামোখা স্কুলে আসিস কেন । বরং মাছ ধর গিয়ে, দুটো পয়সা ঘরে আসবে
।” অবলীলাক্রমে কথাগুলো আউড়ে যান মাস্টারমশাই । মাদলের মনে হল আজ অন্ততঃ একথা মন্দ
লাগছে না । সত্যিই তো, এমন ভরা বাদলে আকাশের মাদলে এই ভাবনাই যেন ধ্বনিত হচ্ছে ।
রবিঠাকুরের ওই গানটা মাথার ভিতর উঁকি দিল – কোথাও আমার হারিয়ে যাওয়ার নেই মানা । ওটা
মা মাঝে মাঝে গেয়ে থাকে, সেই কোন ছোটবেলায় নাকি শিখেছিল ।
মাস্টারমশায়ের কথার
জবাব দেয় না মাদল । কেবল মাথা নিচু করে সাদা খাতার দিকে তাকিয়ে থাকে । ধীরে ধীরে
চোখের সামনে খাতাটা বকের আকার নেয় । এবার বুঝি সে ধর্মরাজের মতো প্রশ্ন করবে –
সত্যিকারের সুখী কে? মাদল জানে সেই মুহূর্তে তার উত্তর হবে – যে অঙ্কের ক্লাসে
আটকে পড়ে না থেকে এক ছুট্টে বড় মাঠটা পার হয়ে জলার ধারে পৌঁছে যায়, আর সারা বেলা
জলে ঢিল ছুঁড়ে ব্যাঙ্গাচির খেলা খেলে ।
“কড়-কড়-কড়াৎ” – বাজ
পড়ল বুঝি কাছেপিঠে কোথাও । “কাল থেকে যেন দেখি খাতায় লিখছিস” – মাস্টারমশাই সমন
জারী করে বেতটাকে ধ্বজার মতো ধরে আবার বোর্ডের দিকে ফিরে যান । মাদলও হাঁপ
ছেড়ে বসে পড়ে, বাকী ক্লাসটা খড়ির দাগেতে বোর্ডে ফুটে ওঠা অঙ্কের ফাঁকেফাঁকে সময়
গুনে কাটিয়ে দেয় । তার গোনা শেষে হতেই ছুটির ঘন্টা পড়ে গেল, যেন মেঘে মেঘে বীণা
বেজে উঠল । আকাশের পরিস্থিতি দেখে কর্তৃপক্ষ আগেভাগেই ছুটি দিয়ে দিয়েছেন ।
মাদল আর একটুকু সময়
নষ্ট না করে স্কুল ব্যাগ কোনরকমে পিঠে নিয়ে চটি পায়ে আছে কি নেই তা না দেখেই বাড়ীর
পথে ছুট লাগাল । বকটা জলার
ধারে এখনও আছে তো? এখন বৃষ্টি না এলেই হল । দৌড়তে দৌড়তে
জলার ধারের উঁচু পাড়টায় পৌঁছে হাঁপ নিয়ে থামে । কি আশ্চর্য, মেঘের ফাঁক দিয়ে এক
চিলতে রোদ ঠিক বকটার ওপর এসে পড়েছে ।
পিঠের থেকে স্কুল
ব্যাগ ঘাসের ওপর নামিয়ে রেখে চটি খুলে পাড় ধরে জলার দিকে মাদল নামতে থাকে । তার
দৃষ্টি বকের ওপর নিবদ্ধ । ক্রমশঃ তার গতি দ্রুত থেকে দ্রুততর হতে থাকে । হঠাৎ তার
পায়ের ধাক্কায় একটা পাথর “ঠকাৎ” করে জলে গিয়ে পড়ল । বিস্তৃত হতে থাকা ঢেউ এগোতে
থাকে বকের দিকে । ঠিক সেই
মুহূর্তে মাদল দেখে বক তার অবস্থানের জায়গাটি ছেড়ে আকাশে ডানা মেললো ।
নাঃ, আজ আর বকের
সামনাসামনি হওয়া গেল না । কাল হয়ত আবার আসবে । একটু বাদে সন্ধ্যা নামবে, আবার হাত
মুখ ধুয়ে পড়তে বসতে হবে । কিন্তু আজ আর মাকে খাবার দেওয়ার জন্য উত্যক্ত করবে না,
বাবার জন্য অপেক্ষা করবে । ততক্ষণ ঠাকুমার কাছে আবার মহাভারতের গল্পটা শুনবে ।
বট-বাবলার মাথা
ছাড়িয়ে বক উড়ে চলে পশ্চিমদিকে । এক ঝাঁক পাখি এসে যোগ দেয় তার উড়ে চলার পথে । কাল
আবার সকাল হবে । এখন সন্ধ্যা নামছে শহর কলকাতাতে, এখন এক অন্য সময় আসন্ন ।