Thursday, April 26, 2018
Tuesday, April 17, 2018
শহরের রোজনামচা: কথোপকথন
দেব চৌধুরীদের ল্যান্সডাউন
রোডের বাড়ীতে আজ সন্ধ্যায় অনেকে নিমন্ত্রিত । বাড়ীর কর্ত্রী মনীষা দেবী তাঁর
ঘনিষ্ঠ কিছু বন্ধুবান্ধবদের নৈশভোজে আপ্যায়ন করেছেন । আজকের অনুষ্ঠানের বিশেষ
আকর্ষণ হল
কবি ময়ূখ দাশগুপ্ত । কিছুদিন আগে তিনি আনন্দ পুরস্কারে
ভূষিত হয়েছেন । গত কয়েকমাস ধরেই মনীষা চেষ্টা করছিলেন এমন এক সন্ধ্যার আয়োজন করতে, কিন্তু সুযোগ পাচ্ছিলেন না । অবশেষে কবি রাজী হওয়াতে মনীষা আর কালবিলম্ব করেননি ।
পুরনো কালের বিরাট
বাড়ীর টানা বারান্দায় জনসমাগম হচ্ছে । অতিথিদের মধ্যে রয়েছে রক্তিম সেন ও রোশনি
চ্যাটার্জী । রক্তিম একেবারে গোড়াতেই এসেছে । কবিতার কোন আসরই সে বাদ দেয় না । নিজে
কবিতা লেখে, দুটো সংকলনও প্রকাশ করেছে । মনীষা তার কবিতার বিশেষ ভক্ত । সংকলনের
কপি এনেছে প্রধান অতিথিকে দেবে বলে । কিন্তু এখনও তিনি উপস্থিত হননি । যারা রয়েছেন
তাঁদের কয়েকজনের সঙ্গে মুখচেনা থাকলেও, সে ভাবে পরিচয় নেই । আজকাল ভিড়্ভারাক্কা ভাল
লাগেনা । আকাশে প্রায়
মিলিয়ে যাওয়া গোধূলি আলো, নানা পাখির দল কলরব করতে করতে বাসায় ফিরছে ।
রোশনি সবে এসে
পৌঁছেছে । সারাদিন অফিস করে, বাড়ী ফিরে আবার বেরতে দেরি হয়ে গিয়েছিল । মনীষার
সঙ্গে তার পরিচয় অল্পকিছুদিনের, এক বিয়েবাড়ীতে । প্রথম আলাপেই মনীষার ভাল লেগে যায়
রোশনিকে । কবিতা নিয়ে নাড়াচাড়া করলেও, রোশনি সেভাবে কবিতাচর্চা কোনদিন করেনি । তবে
মনীষা আমন্ত্রণ জানাতেই, একবাক্যে সে রাজী হয়ে যায় । তাই আজকের অনুষ্ঠানের বিশেষ
তাৎপর্য রয়েছে, বিশেষতঃ যেখানে ময়ূখ দাশগুপ্ত আসবেন । মনীষার বাড়ীতে তার এই প্রথম
আসা । সমবেত অতিথিদের কাউকে সে চেনে না । আকাশে আজ পূর্ণিমার চাঁদ উঠেছে, অনেকদিন
বাদে পূর্ণিমাকে উপভোগ করল রোশনি ।
মূল অনুষ্ঠান হবে
ভিতরের হলঘরে, মনীষা তার তদারকিতে ব্যস্ত । দূর থেকে রক্তিম ও রোশনিকে আলাদা বসে
থাকতে দেখে, মনীষা ব্যস্তসমস্ত হয়ে দুই অতিথির সামনে এসে দাঁড়ালেন ।
“আরে তোমরা এখানে
চুপচাপ বসে রয়েছ? রক্তিম, এ
হচ্ছে রোশনি । আর রোশনি,
ইনি রক্তিম – সেন ।” মনীষা তাঁর দুই আপাত পরস্পরের-অপরিচিত অতিথিদের পরিচয় করিয়ে দিতে ব্যস্ত
হলেন । “তোমরা দুজনে আলাপ করে নিলে ভালই হবে ।” বলে মনীষা পরবর্তী অতিথিদের সঙ্গে কুশলাদি বিনিময়ে মনোযোগ
দিলেন |
রক্তিম ও রোশনির কথোপকথন শুরু হল কথা বলার খানিক পূর্বেই । দু'জনে আকাশের দিকে তাকিয়ে আর দু'জনেরই মনে আকাশটা যেন অন্য মানে নিয়ে ধরা দিয়েছে । সম্বিত
ফিরল বাড়ীর সদর দরজার বাইরে একটা গাড়ী
এসে দাঁড়ানোর শব্দে ।
“নমস্কার,” রোশনি
সপ্রতিভ হয়ে তাকাল ।
“নমস্কার,”
রক্তিমের উত্তরে খানিকটা জড়তা । সদর দরজার দিকে তার নজর,
ওই বুঝি প্রধান অতিথি এলেন ।
“ও গুলো কি ময়ূখ
দাশগুপ্তর কবিতার বই,” রক্তিমের হাতে ধরা বইগুলোর দিকে ইঙ্গিত করে রোশনি জিজ্ঞাসা
করল ।
“না, এগুলো আমার,”
রক্তিমের জড়তা ততক্ষণে চলে গিয়েছে ।
“বাঃ, আপনার কবিতা
শোনার সুযোগ হবে কি আজ?”
“জানিনা,” রক্তিম
খানিকটা উদাসীন হয়ে উত্তর দিল । আজ ময়ূখ দাশগুপ্তর কবিতা শুনতেই এসেছে সবাই ।
তাছাড়া পরিচিত-অপরিচিত সবাইকে নিজের কবিতা শোনানর ইচ্ছে নেই তার ।
দু'জনের ভাবনাগুলো ততক্ষণই চলতে থাকল, যতক্ষণ না রক্তিমের উপস্থিতি এতটাই প্রকট হয়ে উঠল যে রোশনির কাছে আকাশটা আর ধরা দিল না । পরিবর্তে আকাশকে ঢেকে দিল রক্তিমের দীর্ঘ অবয়ব, ঘন দৃষ্টি, ফিকে হয়ে আসা চুল, জড়করা হাত ও বিষাদাচ্ছন্ন মুখ । এবং তা জেনেও রোশনি বলতে বাধ্য হল “আজকের রাতটা কি সুন্দর, না?”
নির্বোধ! ডাহা নির্বোধ! তবে চল্লিশোর্ধে পৌঁছে আকাশের নিবিড় সান্নিধ্যে এমন নির্বুদ্ধিতা হতেই পারে – চাঁদের আলো-ধোয়া বারান্দায় বসে রোশনির তাই মনে হল ।
“বসুন!”
রোশনি তার পাশের ফাঁকা চেয়ারটা দেখাল রক্তিমকে । চেয়ারে বসতে বসতে রক্তিম ভাবল হঠাৎ রোশনি আলাপে আগ্রহী হয়ে উঠল কেন । সে কি সবাই যা বলে সেই 'বিষণ্ণতার ভান' করেছিল এমন সুযোগের অপেক্ষায়?
রোশনিও কি ভাবে কথোপকথন শুরু করবে ভাবতে না পেরে বলল, “আপনি কি সেন-মহাশয় ফ্যামিলির কেউ হন? কলেজে আমার এক সহপাঠিনী ছিল, বর্ণালী । ওর সঙ্গে আপনার চেহারার খুব মিল আছে । বর্ণালী ওই ফ্যামিলির মেয়ে ।”
“হ্যাঁ, বর্ণালী আমার খুড়তুতো বোন । আমেরিকায় ওর বিয়ে হয় । এখন বোধহয় Alabamaতে আছে । আমার সঙ্গে অনেকদিন যোগাযোগ নেই ।”
রোশনির মনে হল যে কাষ্ঠতার মুখোশ পরে লোকটা এতক্ষণ বসে ছিল, সেটা যেন হঠাৎ খুলে গেছে । চাঁদের আলোয় আসল মানুষটাকে সে উপলব্ধি করতে পারছে । “মাভৈঃ,” রোশনি নিজের মনেই বলে উঠল, যেন নিজেকে সান্ত্বনা দেওয়া । এই বয়েসে খানিকটা যেন নিজেকে জোর করা । না ভীতিজনক নয়, বরং নিরুৎসাহতা – বিশেষতঃ পুরুষমানুষে – কথোপকথনে ভাগ নেওয়ার কথা ভেবে । কোনোভাবেই সে পরবর্তী কথা কি বলবে ভেবে উঠতে পারে না ।
তার হাতগুনতি কয়েকজনমাত্র পুরুষবন্ধু আছে । সত্যিই কি সে তাদের সান্নিধ্য কামনা করে? যদি নাই করে, তবে এই মুহূর্তে, এই জ্যোৎস্নালোকিত রাতে, রক্তিমকে উপলব্ধি করার কথা তার মনে হল কেন? এই ভাবনাকে প্ররোচন করা কি উচিৎ? না কি অন্য পরিস্থিতির মতই একেও পাশ কাটিয়ে যাওয়া ভাল?
রক্তিমের কি পারিবারিক ঐতিহ্য নিয়ে কি গর্ব নেই ? ওর মনে পড়ল বর্ণালীর কাছে শোনা এই পরিবারের কত অজানা কাহিনী । এমন দ্বন্দ্বের মুখোমুখি হয়ে নিজের মনকে প্রবোধ দিল রোশনি – থাক, অনেক হয়েছে নিজেকে গুটিয়ে রাখা । অতএব, “মাভৈঃ!”
রোশনির পরবর্তী প্রশ্ন রক্তিমকে - “আচ্ছা, আপনিও কি পারিবারিক ব্যবসায় জড়িয়ে ?”
রক্তিম রোশনির জিজ্ঞাসু দৃষ্টির দিকে এক পলক তাকিয়ে উদাস ভাবে ঘাড় নাড়ল - “না !”
বলেই নিজের মনে খটকা লাগল । তার ঠাকুরদা ও বাবা দুজনেই চেয়েছিলেন রক্তিম তার দাদা আবীরের সঙ্গে পারিবারিক ঐতিহ্যটা বজায় রাখুক । কিন্ত কোনো সময়ই রক্তিম ও পথে পা বাড়াতে চায়নি ।
অথচ ছোটবেলায় বাবার সঙ্গে ছুটির দিনগুলোতে প্রায়ই দোকানে যেত । ঘন্টার পর ঘন্টা বসে বসে দেখত কত ধরণের খদ্দের আসছে । ম্যানেজার বঙ্কুবিহারী বাবুর সঙ্গে ছিল তার খুব খাতির । নতুন মিষ্টি হলেই শোকেসে সাজানোর আগে বঙ্কুবাবু তার জন্য দু-একটা নমুনা তুলে রাখতেন । তিনপুরুষ ধরে তাঁরাও এই ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিলেন ।
আর একটু উঁচু ক্লাসে ওঠার পর, রক্তিম ক্যাশবাক্সে বসার অধিকার পেয়েছিল । তার ঠাকুরদার বাবার আমলের মেহগনি কাঠের তৈরী সেই বাক্স | ছোটবেলা থেকেই ওটার প্রতি একটা অদ্ভুত কৌতূহল ছিল । অথচ কলেজে ঢোকার পর, সব কিছু যেন আমূল বদলে যায় ।
রোশনির একাগ্রদৃষ্টি
যেন তাকে নিরীক্ষণ করছে । সে কি তার মনের দ্বন্দ্বটা বুঝতে পারছে? এই মনোরম
পরিবেশেও রক্তিমের ঘাড়ের কাছটা উষ্ণ হয়ে উঠল । পাঞ্জাবীর পকেট থেকে অভ্যাসবশত
রুমাল বার করে ঘাড় মুছতে মুছতে এদিকওদিক তাকাল – নাঃ, ময়ূখ দাশগুপ্ত এখনও পৌঁছননি
। রুমাল পকেটে ঢোকাতে ঢোকাতে বলল “না
মানে, এখন পারিবারিক ব্যাবসার দেখাশুনো আমার দাদা আর কাকা, মানে বর্ণালীর বাবা,
করে থাকেন ।”
উর্দিপরা কেটারিং
বয় ফিশফ্রাই আর নলেন গুড়ের সন্দেশের প্লেট সামনে এগিয়ে ধরাতে রক্তিম যেন কথার খেই
ধরতে পারে । রোশনি সেটা
আন্দাজ করে তার সামনে ধরা একই রকমের প্লেট থেকে কেবল একটা মিষ্টি তুলে নিয়ে আলতো
করে কামড় দিল । তারপর সেই একই দৃষ্টিতে রক্তিমকে অবগাহন করে প্রশ্ন করল “তার মানে
আপনাকে যদি জিজ্ঞেস করি এখন ‘সেন মহাশয়’ এর কোন মিষ্টি সব চেয়ে পপুলার, তার উত্তর
আপনি দিতে পারবেন । তাই তো?” বলেই মুচকি হেসে কপালের ওপর উড়ে পড়া চুল বাঁ হাত দিয়ে সরাতে সরাতে পাশে
রাখা সরবতের গ্লাসে চুমুক দিল ।
সত্যিই তো আজ অনেক
বছর হয়ে গেল রক্তিম ব্যাবসাসংক্রান্ত বিষয় থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছে । কোনমতেই সে নিজেকে পারিবারিক বিষয়সম্পত্তিতে জড়াতে চায় না । কিন্তু কেন – সে কৈফিয়ত তো তার
কাউকে দেওয়ার দরকার নেই। অন্ততঃ ওই
জিজ্ঞাসু দৃষ্টির সামনে সে আত্মসমর্পণ করবে না । অথচ পারিবারিক ব্যাবসার বাইরেও যে
জগৎটা আছে, সেখানে তার সম্পৃক্ততার কোন খামতি নেই । আজ এই মজলিশে আসার কারণ তো সেই
জগতে গতিবিধির জন্যেই ।
“না, মানে এই মুহূর্তে
হয়ত বলতে পারব না । তবে জানতাম, একসময়ে জানতাম ।”
রক্তিম কতকটা
উদাসীনতার সুরে, যেন গভীর আত্মবিশ্লেষণে মগ্ন, এমনভাবে উত্তর দিল । যেন রোশনিকে
পরবর্তী প্রশ্নের জন্য উন্মুখ করা । অথচ ওর এই নিরাসক্ত ভাবটা বন্ধুমহলে, বিশেষতঃ
কবিবন্ধুদের মাঝে, বেশ জনপ্রিয় । তবে সর্বক্ষেত্রে নয় ।
প্রতিদিন সকালে যখন স্ত্রী
সুরমার জন্য প্রাতঃরাশের আয়োজন করে, তখনও তার মধ্যে এই নিরাসক্ত ভাবটাই থাকে ।
সুরমা আজ প্রায় দশ বছরের ওপর পক্ষাঘাতে শয্যাশায়ী । সারাক্ষণের দেখাশুনোর একজন আয়া
নিযুক্ত করা হয়েছে । কিন্তু সকালটা রক্তিম নিজের হাতে আয়োজন করা খাবার সুরমার
বিছানার পাশের টেবিলটাতে রেখে তার মাথায়
হাত রেখে ঘুম ভাঙ্গায় ।
কবিতার আসরে নিরাসক্তিটাতে অন্য মানে নিয়ে আসে । স্বরচিত
কবিতা যখন পড়ে, তখন আসরের অন্যান্য শ্রোতারা, বিশেষতঃ মহিলারা, তার অনুধাবনে যে
নিমগ্ন থাকে, সেটা রক্তিম ভালমতই বুঝতে পারে । তার মনে হয় সমাজকে সে অনেক কিছুই দিয়েছে
এবং প্রতিনিয়ত দিয়ে চলেছে – প্রতিদানে এটুকু প্রশংসা তার প্রাপ্য ।
“পলাশ আগুন, বনের ফাগুন –
রাঙাল তোমার চোখের চাহন “
রোশনিকে দেখে
নিজেরই লেখা কবিতার লাইনগুলো মনে পড়ে গেল । শ্রাবণ পূর্ণিমার আলোতে রোশনির অবয়ব
যেন রহস্যময়ী হয়ে উঠেছে ।
কত হবে রক্তিমের
বয়স? বর্ণালীর দাদা যখন, পঞ্চাশের কাছাকাছি তখন নিশ্চয়ই । ভাবনাটা উঁকি দিল রোশনির
মনে । ওর ওই নিরাসক্ত ভাবটা কি মনের কোন গোপনতার ইঙ্গিত দিচ্ছে ? না এই প্রশ্নের
ধারাকে এড়ানোর প্রচেষ্টা? এই মাঝবয়সী লোকটাকে কি সমবেদনা জানাবে । মিষ্টির
ব্যাপারে তার জ্ঞান সীমিত । শরীরটাকে ফিট
রাখতে রোজ সকালে যোগব্যায়াম করে । মিষ্টি বা দোকানের কোন খাবার পারতপক্ষে ছোঁয় না
। তবে কি প্রশ্নটা করা উচিৎ হয়েছে?
“আশ্চর্য,
আপনি আমাকে প্রশ্নটা করলেন, এদিকে আপনি কিন্তু
নিজে মিষ্টি খেলেন না দেখলাম ।” রক্তিম মুচকি হেসে জবাব দিল । “তবে দুজনায় যখন পরিচিত হওয়ার জন্য আলাপ করে,
তখন অপ্রাসঙ্গিক কিছু কথা উঠতেও পারে । এও কি সেরকম কিছু?”
নাঃ, লোকটা হয়ত
সত্যিই কোন আঘাত পেয়েছে । রোশনি আর একবার মনে করার চেষ্টা করল বর্ণালী কখনও তার এই
দাদার সম্বন্ধে কিছু বলে ছিল কিনা ।
“মানে, বর্ণালীকে
জিজ্ঞেস করলে ও কিন্তু সবসময়ে একটা না একটা মিষ্টির নাম বলত । তাই ভাবলাম পরিবারের
বাকীরাও হয়ত সেই ধরণের উত্তর দিতে পারবে ।” বর্ণালী তাকে দু’একবার সঙ্গে করে নিয়ে
গিয়েছিল ওদের দোকানে । তবে সেই স্মৃতিপটে রক্তিমের কোন ছবি ছিল না ।
“নাঃ, আপনি দেখছি
আমার থেকে আমার পরিবারের সম্বন্ধেই বেশী উৎসাহী । আপনি কিন্তু হতাশ হবেন, কারণ আমি
সত্যিই আমার পরিবার নিয়ে আলোচনা করতে রাজী নই ।” রক্তিম স্মিত হেসেই বোঝানর চেষ্টা
করল । রোশনিও জানে বর্ণালীর পরিবার সম্বন্ধে আলোচনা করার কোন উৎসাহ তার নেই । তবে
আর কোনভাবে রক্তিমের সান্নিধ্য থেকে মুক্তি পাওয়া যায় । আর পাঁচজনের মত এও ওই
ধারণা নিয়ে নিজের থেকে যাবেনা । সত্যি তার মনোভাবটা কি, সেটা জানাবে রক্তিমকে ?
“আপনাদের পরিবারকে
আমার খুব ভাল লাগত । আপনাদের ভবানীপুরের বাড়িতে আমি বেশ কয়েকবার গিয়েছি বর্ণালীর
সঙ্গে । তবে আপনাকে কখনও দেখেছি বলে মনে পড়ছে না ।”
“বর্ণালীর অনেক
বন্ধুর সঙ্গে আমার আলাপ ছিল । কিন্তু আপনাকে কখনও দেখিনি ।”
রক্তিমের কথায়
রোশনির মনে হল লোকটার মনের জড়তা বা দ্বন্দ যেটা এতক্ষণ সে অনুভব করছিল সেটা
খানিকটা যেন লাঘব হয়েছে । রক্তিমের মধ্যে যেন একটু স্বাচ্ছন্দ্য এসেছে । রক্তিম
উঠে খালি প্লেটটা কেটারিং বয়ের হাতে দিয়ে এক গ্লাস সরবৎ নিয়ে রোশনির মুখোমুখি
চেয়ারটা ঘুরিয়ে বসল ।
“আমাদের বাড়িতে এসে
থাকলেও তো সে প্রায় বিশ বছর আগেকার কথা, তাই না?”
প্রশ্নটা একটু জোর
দিয়েই করল রক্তিম । যেন একটা চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিল রোশনিকে । দেখাই যাক আলোচনাটা
এখন কোন দিকে নিয়ে যান ভদ্রমহিলা । একটু দূরে একটা পরিচিত গলা শুনে রক্তিম ঘাড়
ঘুরিয়ে দেখল । সল্ট লেক থেকে সাধনা বসু এসে পৌঁছেছেন । মাস দুয়েক আগে ওনার বাড়ীতে
কবিতার আসর বসেছিল, কিন্তু রক্তিমের যাওয়া হয়ে ওঠেনি ।
রোশনি স্মিতহাসি
নিয়ে কানের ওপর ঝুঁকে পড়া চুলের গোছা আলতো করে সরিয়ে হাতেধরা গ্লাসটার দিকে তাকিয়ে
থাকল । কি ভাবছে রক্তিম ? সে যাই ভাবুক,
তার কি সত্যিই জানার দরকার আছে? যাক না রক্তিম নিজের ভাবনায় ভেসে । হয়ত বা কোনো অদ্ভুত ধারণা নিয়ে থাকবে বিশ বছর আগেকার কথা ভেবে
। বর্ণালীদের বাড়ীর ছাদটার কথা মনে পড়ল । সাবেকী বাড়ীর সাবেকী ধাঁচের গঠন । তবে প্রছুর ফুল গাছে ভরা ছিল । মাঝেমধ্যে কলেজের বন্ধুরা
মিলে তার মাঝে বসত আড্ডা দিতে । ছাদে ওঠার সিঁড়ির মুখেই ছিল চিলেকোঠার একটা ঘর ।
কখনসখন পুরুষের ভারী গলার গান শুনেছিল ওই ঘরের পাশ দিয়ে ছাদে যেতে । সে কি রক্তিম?
জিজ্ঞাসা করবে নাকি গানের কথা?
“হ্যাঁ, তা তো বটেই
। তবে আপনাকে কখনো ও বাড়ীতে দেখেছি বলে মনে পড়ছে না ।” গ্লাসের ওপর থেকে চোখ সরাতে
সরাতে বলল রোশনি ।
“আমার ও মনে পড়ছে
না যে আপনাকে দেখেছি বলে ।” কতকটা যেন স্বগতোক্তির মতই শোনাল রক্তিমের জবাব ।
নাঃ, লোকটাকে
সোজাসুজি প্রকৃতিরই মনে হচ্ছে । গায়ে পড়া নয়, অন্ততঃ প্রথমে যে রকম ভাবনা হয়েছিল
রোশনির সে রকমটা আর নয় ।
দৃষ্টি বিনিময় হল
আবার দু’জনের – নাকি দৃষ্টির সংঘাত! দুজনারই মনে হল অপরের দৃষ্টির অন্তরালে যে
নিঃসঙ্গ প্রাণ লুকিয়ে আছে, যার বহিঃপ্রকাশ ঘটানর কাজ নিজের ওপর ন্যস্ত হয়েছে, সেই
আত্মগোপন করে থাকা মানুষটা যেন হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিল । অনুভূতিটা
একদিকে যেমন ভীতিকর, অন্যদিকে তেমনি সুখকর ।
তাদের দুজনারই জীবন
বয়সকালের ছোঁয়া লেগে যেন সমৃদ্ধ হয়ে উঠেছে । সেই কারণে আজকের মত সমাবেশ রক্তিমের
তেমন চিত্তাকর্ষক লাগে না, আবার এমন আসর ছেড়ে চলে যাওয়ার পর একটা বিষণ্ণতাও ভর করে
। কিন্তু আজ যেন অন্যকিছুর একটা ছোঁয়া লাগল । বিশ বছর আগে কেন তার সঙ্গে রোশনির
দেখা হয়নি । হলে কি তার জীবনটা অন্য খাতে বইত? বিশ বছর আগে কলেজ সোশ্যালে সুরমার
সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল । সুরমা অন্য কলেজ থেকে এসেছিল বন্ধুদের সাথে তাদের কলেজের অনুষ্ঠানে
অংশগ্রহণ করতে ।
বিশ বছর আগে
রক্তিমের সঙ্গে দেখা হয়নি বর্ণালীদের বাড়ীতে । হলে কি হত – ভাবতে লাগল রোশনি ।
মাঝেমধ্যে ঘর বাঁধার ভাবনাটা যে একেবারে উঁকি দেয়নি মনে তা তো নয় । হতে পারত তার
জীবনটাও অন্যরকমের, হয়ত হতে পারত –
নাঃ, দেখা-না-দেখার
তর্কটাকে মনের মধ্যেই অবসান দেওয়া যাক । কই, আর তো সেই অনুভূতিটা হচ্ছে না । বরং
মনে হচ্ছে সে যেন রক্তিমকে চেনে, বহু বছর যাবৎ, এবং বেশ ভাল মতনই সেই চেনা ।
এতোটাই চেনা যে তার সঙ্গে স্রোতে গা ভাসাতে একটুকুও দ্বিধা হবে না ।
রোশনির মনে হল – সব
কিছুর মধ্যে সবথেকে অদ্ভুত এই মানবসঙ্গম । কারণ এই সঙ্গম বড় খামখেয়ালী, কোনো
ব্যাকরণ মানে না । রক্তিম-সম্পর্কে তার যে বিতৃষ্ণা প্রথমে জেগে উঠেছিল, তা কি এখন
ভালোলাগার রূপ নিতে চলেছে? নাঃ, তা কি করে হয় । ভাবনাটাকে মন থেকে তাড়াতে হবে । এই
ব্যাথাবেদনার সঙ্গে ভালোলাগাটা জড়িয়ে গেলে পরিস্থিতিটা মোটেই সুখকর হবে না । কি বলা যায়
এই অনুভূতিকে? একটা বিচ্ছিন্ন মনোভাব নিয়ে তারা কথোপকথন শুরু করেছিল । এখন কি তার
ব্যাতিক্রম ঘটতে চলেছে?
“কুড়িটা বছর কেটে
গেল, পরিচিতদেরই ভুলতে বসেছি
। অথচ যাদের সঙ্গে পরিচয়ই হয়নি তাদের না মনে রাখার কথাটা কেমন
জোর দিয়ে বলছি দেখুন ।”
রক্তিম মুচকি হাসল
। রোশনি ঠিকই বলেছে । হাতের গ্লাসটা পাশের টেবিলে নামিয়ে রেখে পা দুটোকে স্থান
পরিবর্তন করল । কথোপকথন তবে সত্যিই শেষ হতে চলেছে । এরপর আবার সেই বিষণ্ণতা গ্রাস
করবে । শত চেষ্টাতেও ভাবনাচিন্তাগুলোকে জাগিয়ে রাখা যাবে না । কথার ফল্গুধারা পড়বে
লুকিয়ে । রক্তিম আর রোশনি মুখ চাওয়াচাওয়ি করল ।
কেটারিং বয়ের প্লেট
থেকে একটা মিষ্টি তুলে নিয়ে সাধনা বসু এক ঝলক হাসি নিয়ে রক্তিমের সামনে এসে
দাঁড়ালেন । গলা তুলে অনুযোগের সুরে বললেন, “কই, আপনি তো আমার বাড়ীর কবিতার আসরে
এলেন না সেদিন । ভেবেছেন আপনাকে মাফ করে দেব?”
রক্তিম আর রোশনি পরস্পরের
কাছ থেকে আলাদা হয়ে গেল ।
প্রিন্সটন, নিউ জার্সি
১১ই জানুয়ারী, ২০১৭
Subscribe to:
Posts (Atom)
আলোয় ফেরা
প্রতি বছর সময়ের কাঁটা মিলিয়ে এই বৈশাখ মাসে আমার নিউ জার্সির ঘর-গেরস্থালির আশপাশ ঘিরে প্রকৃতি অপরূপ সাজে সেজে ওঠে । কোথায় “দারুণ অগ্নিবা ...
