Sunday, November 4, 2018

শহরের রোজনামচা: সকাল-সন্ধ্যা


ইস্টার্ন বাইপাসের ধারে জলা জায়গাটা ঘিরে হাঁসেদের জটলা । এদিকে তেমন ঘরবাড়ী নেই, তাই বর্ষার ঢল নামতেই নানা পাখীর দল ভিড় করেছে এই সাতসকালে । দূরে বাইপাসে দু-একটা গাড়ী মাঝেমধ্যে হুসহাস করে চলে যাচ্ছে । হাঁসেদের উচ্চস্বরে ডাকাডাকি আর কোলাব্যাঙের ঘ্যাঙরঘ্যাঙ সেই যান্ত্রিক শব্দকে ছাড়িয়ে ঐক্যতান সৃষ্টি করেছে ।

ফড়িংগুলো এক শালুকের রেণু মেখে অন্য শালুকের কাছে ভিড় করতে ব্যস্ত । জলের ধার ঘেঁসে বক ধ্যানমগ্ন হয়ে সেই দৃশ্য দ্যাখে । বর্ষার টইটুম্বুর জলায় মাছের চারারা দ্বিগুণ উৎসাহে দাপাদাপি করছে । তাতে বকের কোন ভ্রুক্ষেপ নেই । মনে হয় পৃথিবী রসাতলে গেলেও তার ধ্যান ভাঙবে না । এ যেন কৈলাসে অধিষ্ঠিত দেবাদিদেব মহাদেব ।

আকাশপানে ছড়িয়ে থাকা শাপলার পাপড়িতে এক ফোঁটা বৃষ্টি পড়ল । শালুকের ডাঁটা বেয়ে উঠতে থাকা শামুকের দল থমকে গেল । আবার মেঘের পর্দার আড়ালে মুখ লুকল সূর্য । তবুও বকের পৃথিবীতে তার কোন ছায়া পড়ে না । কেউ জানেনা সে কি ভাবছে, কিংবা আদও সে কিছু ভাবছে কিনা ।

“ঝপাং” শব্দে জলার অতিথিরা চমকে উঠল ক্রমশঃ বিস্তৃত হতে থাকা ঢেউ এসে ছুঁল খাড়া হয়ে থাকা বকের পায়ে হঠাৎ ধ্যান ভেঙ্গে দুডানার সাহায্যে সে উড়ল আকাশে “ব্যাটা বক ধার্মিক” – দাঁত বের করে এক চোট হাসল মাদল পিঠে স্কুলের বইখাতা ভর্তি ব্যাগ, দুই হাতে নুড়িপাথর ঠাকুমার কাছে মহাভারতের গল্পটা সে শুনেছে । ধর্মরাজের মতো বকটাও কি কাউকে প্রশ্ন করার জন্যে অপেক্ষা করে আছে । সেটা পরীক্ষা করতেই তার হাতের নুড়ি স্থানচ্যুত হয়ে পড়েছে ।

বক জলাটাকে ঘিরে ওপরে উঠতে থাকে আবার জলে এসে পড়ে মাদলের নুড়ি এবারে হাঁসের দল ভয় পেয়ে আওয়াজ করতে করতে উঁচু পাড়ের দিকে রওয়ানা দিল সেই দেখে বক আরও দু চক্কোর মেরে বট গাছের উঁচু ডালের ওপর এসে বসল মাদল চেষ্টা করে হাতের নুড়িটাকে তাক করে বকের দিকে ছুঁড়তে, কিন্তু নিশানার ধারেকাছে পৌঁছয় না অগত্যা বিফল মনে কালিকাপুরের ষষ্ঠ শ্রেণীর ছাত্র স্কুলের পথে পা বাড়ায় ।

মাদল চোখের আড়াল হতেই উচ্চাসন ছেড়ে সাবলীল ভঙ্গীমায় ডানা বিস্তার করে বক আবার জলের ধারে তার আগের জায়গাটিতে এসে স্থিত হয় । কলকাতার পুকুর-ডোবাগুলো একে একে ভরাট হয়ে যাচ্ছে । বককে তাই অনেকটা পথ উড়ে আসতে হয় এই জলার ধারটুকুর নিরবচ্ছিন্ন আশ্রয়ের জন্য । তার যাতায়াতের পথ এই অস্থির শহরটার উপরের আকাশটাকে চিরে যায়

আজই তো ভোরে প্রথম আলোর ঝলকানিতে তার বাসা ছেড়ে পূবমুখে উড়ে যেতে যেতে ময়দানের গাছগাছালির মাঝে একটু থামার প্রচেষ্টা নিয়েছিল সেখানেও “দুম্‌” আওয়াজে জিরোন বন্ধ রেখে আবার সে ওড়া শুরু করে সবুজ ঘাসের ওপর পড়ে থাকা এক যুবকের নিথর শরীরের ওপর তার ছায়া পড়েছিল কিনা জানা নেই

চঞ্ছু ডুবিয়ে বক বেশ অনেকখানি জল টেনে নিল । বর্ষার কল্যাণে শালুক-শাপলার গুটি ভেসে উঠেছে । তাদেরই একটা একটা করে গলাধকরণ করে গা পরিষ্কারে মন দিল । অনেকক্ষণ ধরে সাফসুতরো করে আবার চোখ বুজে সে ধ্যানস্থ হল ।

অঙ্কের ক্লাসে ভয়েভয়ে খাতা খুলে বসল মাদল মাস্টারমশাই বোর্ডেতে চক দিয়ে একের পর এক লসাগু-গসাগুর দুর্বোধ্য আঁক কষে চলেছেন – এই বুঝি ছাত্রদের মুখোমুখি হয়ে বলবেন বাকীটা শেষ করতে না পারলে হয় বেতের বাড়ি, নয়তো  কান ধরে বেঞ্চির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা এমন বাদলার দিনে কি আকাশের ভ্রুকুটি ছেড়ে অঙ্কের মাস্টারের চোখ রাঙ্গানি দেখতে ইচ্ছে করে
অনিচ্ছাসহকারে তালিমারা স্কুলের ব্যাগ থেকে মাদল তার কড়ে আঙ্গুলের সমান একটা পেন্সিল বার করে জিভেতে পেন্সিলের ডগাটা ছুঁইয়ে সে বোর্ডেতে লেখা আঁকগুলোর নকলনবীশীর প্রচেষ্টা নেয় পেন্সিলের ডগাটা ভোঁতা হয়ে এসেছে, একটু চাপ দিতেই “মট” আওয়াজে বোঝা গেল আর অগ্রসর হওয়া যাবেনা আর লেখা থামলেই তা অবশ্যম্ভাবীরূপে মাস্টারমশায়ের চোখে পড়বে

মাথা নিচু করে মাদল লেখার ভান করে । খিদেটা বেশ চাগিয়ে ঊঠেছে । সকালে এক থালা পান্তাভাত খেয়ে স্কুলে এসেছে, আবার বিকেলে ফিরে মুড়ি খাবে । এর মাঝে আর কোন খাওয়া নেই । বাড়ন্ত বয়সে খিদেটা বাগ মানেনা । পঞ্চম শ্রেণী অবধি স্কুলে খাওয়া দিত, এখন তার পাট চুকে গেছে । তবে আজ বাবা এক বড় ভোজের জায়গায় গিয়েছে । বিশ্বনাথ ইদানীং কেটারিং সংস্থায় বেয়ারার কাজ করছে । তাই আজকাল মাদলদের বাড়ী বাড়তি খাবার আসে ।

আজ বাবা কি আনবে – গতসপ্তাহে বেশ বড় সাইজের হিঙ্গের কচুরী আর ছোলার ডাল এনেছিল, আর গতমাসে ভেজিটেবল চপ । তবে মাছ-মাংস আসে না, ওসব নাকি বাড়তি হয় না । হাতের পেন্সিলটা হঠাৎ হাত থেকে বেরিয়ে ঠকাস করে মাটিতে পড়ে গেল । পরিবর্তে দুই আঙ্গুলের ফাঁকে যেটা দেখা দিল সেটা বোধহয় এই মুহূর্তে আশাপ্রদ নয় – অঙ্ক মাস্টারের বেত ।

“কিরে মাদল, আজ বুঝি অঙ্কে মন নেই । তা খামোখা স্কুলে আসিস কেন । বরং মাছ ধর গিয়ে, দুটো পয়সা ঘরে আসবে ।” অবলীলাক্রমে কথাগুলো আউড়ে যান মাস্টারমশাই । মাদলের মনে হল আজ অন্ততঃ একথা মন্দ লাগছে না । সত্যিই তো, এমন ভরা বাদলে আকাশের মাদলে এই ভাবনাই যেন ধ্বনিত হচ্ছে । রবিঠাকুরের ওই গানটা মাথার ভিতর উঁকি দিল – কোথাও আমার হারিয়ে যাওয়ার নেই মানা । ওটা মা মাঝে মাঝে গেয়ে থাকে, সেই কোন ছোটবেলায় নাকি শিখেছিল ।

মাস্টারমশায়ের কথার জবাব দেয় না মাদল । কেবল মাথা নিচু করে সাদা খাতার দিকে তাকিয়ে থাকে । ধীরে ধীরে চোখের সামনে খাতাটা বকের আকার নেয় । এবার বুঝি সে ধর্মরাজের মতো প্রশ্ন করবে – সত্যিকারের সুখী কে? মাদল জানে সেই মুহূর্তে তার উত্তর হবে – যে অঙ্কের ক্লাসে আটকে পড়ে না থেকে এক ছুট্‌টে বড় মাঠটা পার হয়ে জলার ধারে পৌঁছে যায়, আর সারা বেলা জলে ঢিল ছুঁড়ে ব্যাঙ্গাচির খেলা খেলে ।

“কড়-কড়-কড়াৎ” – বাজ পড়ল বুঝি কাছেপিঠে কোথাও । “কাল থেকে যেন দেখি খাতায় লিখছিস” – মাস্টারমশাই সমন জারী করে বেতটাকে ধ্বজার মতো ধরে আবার বোর্ডের দিকে ফিরে যান মাদলও হাঁপ ছেড়ে বসে পড়ে, বাকী ক্লাসটা খড়ির দাগেতে বোর্ডে ফুটে ওঠা অঙ্কের ফাঁকেফাঁকে সময় গুনে কাটিয়ে দেয় । তার গোনা শেষে হতেই ছুটির ঘন্টা পড়ে গেল, যেন মেঘে মেঘে বীণা বেজে উঠল । আকাশের পরিস্থিতি দেখে কর্তৃপক্ষ আগেভাগেই ছুটি দিয়ে দিয়েছেন ।

মাদল আর একটুকু সময় নষ্ট না করে স্কুল ব্যাগ কোনরকমে পিঠে নিয়ে চটি পায়ে আছে কি নেই তা না দেখেই বাড়ীর পথে ছুট লাগাল বকটা জলার ধারে এখনও আছে তো? এখন  বৃষ্টি না এলেই হল দৌড়তে দৌড়তে জলার ধারের উঁচু পাড়টায় পৌঁছে হাঁপ নিয়ে থামে । কি আশ্চর্য, মেঘের ফাঁক দিয়ে এক চিলতে রোদ ঠিক বকটার ওপর এসে পড়েছে ।

পিঠের থেকে স্কুল ব্যাগ ঘাসের ওপর নামিয়ে রেখে চটি খুলে পাড় ধরে জলার দিকে মাদল নামতে থাকে । তার দৃষ্টি বকের ওপর নিবদ্ধ । ক্রমশঃ তার গতি দ্রুত থেকে দ্রুততর হতে থাকে । হঠাৎ তার পায়ের ধাক্কায় একটা পাথর “ঠকাৎ” করে জলে গিয়ে পড়ল । বিস্তৃত হতে থাকা ঢেউ এগোতে থাকে বকের দিকে ঠিক সেই মুহূর্তে মাদল দেখে বক তার অবস্থানের জায়গাটি ছেড়ে আকাশে ডানা মেললো ।

নাঃ, আজ আর বকের সামনাসামনি হওয়া গেল না । কাল হয়ত আবার আসবে । একটু বাদে সন্ধ্যা নামবে, আবার হাত মুখ ধুয়ে পড়তে বসতে হবে । কিন্তু আজ আর মাকে খাবার দেওয়ার জন্য উত্যক্ত করবে না, বাবার জন্য অপেক্ষা করবে । ততক্ষণ ঠাকুমার কাছে আবার মহাভারতের গল্পটা শুনবে ।

বট-বাবলার মাথা ছাড়িয়ে বক উড়ে চলে পশ্চিমদিকে । এক ঝাঁক পাখি এসে যোগ দেয় তার উড়ে চলার পথে । কাল আবার সকাল হবে । এখন সন্ধ্যা নামছে শহর কলকাতাতে, এখন এক অন্য সময় আসন্ন ।

No comments:

Post a Comment

আলোয় ফেরা

প্রতি বছর সময়ের কাঁটা মিলিয়ে এই বৈশাখ মাসে আমার নিউ জার্সির ঘর-গেরস্থালির আশপাশ ঘিরে প্রকৃতি অপরূপ সাজে সেজে ওঠে । কোথায় “দারুণ অগ্নিবা ...