“বড়দামশাই, চারটে বাজতে চলল । তুমি উঠবে না ?”
আলপনার গলা পেয়ে গণেশের ঘুমটা ভেঙ্গে গেল । ছোটভাই
কার্তিকের মেজোছেলের চোদ্দ বছরের মেয়ে আলপনা । বড়দামশায়ের সব দেখাশুনোর দায়িত্ব
যেন তার । বলাবাহুল্য গণেশ খুবই
স্নেহ করেন তাঁর এই নাতনিকে । আর করবেন নাই বা কেন । তাঁর দুই ছেলের পারিবারিক
ঐতিহ্য বজায় রাখার কোনরকম উৎসাহ ছিল না । আজ পাঁচ পুরুষ ধরে তাঁদের এই কুমোরটুলিতে
আস্তানা । বিয়ের পরে ছেলেরা আলাদা হয়ে গিয়েছে । কার্তিকের পরিবারেও একই অবস্থা,
কেবল মেজোছেলে শঙ্কর হাল ধরে রেখেছে । কার্তিক আজ পাঁচ বছর হল গত হয়েছে, গণেশও আট বছর যাবদ বিপত্নীক । ইদানীং স্কুলের পড়ার
ফাঁকেফাঁকে আলপনা তার বাবা আর বড়দামশাইকে প্রতিমা গড়ার কাজে সাহায্য করে থাকে ।
আজ মহালয়া । আর বছরের মতো রেডিওতে “মহিষাসুরমর্দিনী”
অনুষ্ঠান শুনবেন । স্ত্রী কমলা যখন ছিলেন তখন প্রতিবছর এই সময় দু’কাপ চা বানিয়ে
আনতেন, তারপর ধোঁয়াওঠা চা সহযোগে বাকী অনুষ্ঠানটা
দুজনে মিলে উপভোগ করতেন । কোন কোন বছর ঘুমিয়ে পড়তেন, কমলার ডাকে যখন ঘুম ভাঙ্গত
তখন অনুষ্ঠান প্রায় শেষ, রেডিওতে মাঙ্গলিক শাঁখ বাজছে । তবুও মনটা ভরে থাকত । এখন
শঙ্করদের ঘরের টেলিভিশনে শোনেন আরও নানাধরনের অনুষ্ঠান চলছে,
অনেক বেলা অবধি ।
আলপনা এসে গণেশকে উঠে বসতে সাহায্য করে, ঘরের কোণের আলনা থেকে ফতুয়াটা এনে দেয় । গণেশ
হাত গলিয়ে গায়ে জামাটা টেনে নিয়ে মাথার কাছে টুলের ওপর রাখা মোটা কাঁচের চশমাটা
চোখের ওপর ঠিক করে বসিয়ে নেন । অন্ধকারে চোখ ধাতস্ত হতে সময় লাগে । আলপনাই তাঁকে
ধরে বাইরের বারান্দায় নিয়ে আসে । বালতিতে রাখা জলে প্লাস্টিকের মগ ডুবিয়ে আচমন
করেন, চোখেমুখে জলের ছিটে দিয়ে লুঙ্গির খুঁটের সাহায্যে মুখ মুছে শত তাপ্পিমারা
জীর্ণ ইজিচেয়ারটায় গা এলিয়ে দেন ।
“একি বড়দামশাই, তোমার সখের রেডিওটার কাছে গিয়ে বসবে না,”
আলপনার গলায় বিস্ময়ের সুর ।
“না মা, আজ আমি দূর থেকেই অনুষ্ঠান শুনব,” গণেশ তাকে
আশ্বস্ত করেন ।
আলপনা আর দ্বিরুক্তি না করে নিজেদের ঘরের দিকে এগোয় । অন্ধকারে
গণেশ তার মিলিয়ে যাওয়া অবয়ব যেন দেখতে পান । গতবছর এই সময় একহাত দূরের জিনিসও
দেখতে পারতেন না, ফলে
প্রতিমা গড়ার কাজে বেশ ভাঁটা পড়ে । শঙ্কর বেশ কয়েকজন চোখের ডাক্তারের কাছে নিয়ে
গিয়েছিল, সকলের এক অভিমত – নতুন কর্ণিয়া বসাতে হবে । কিন্তু তাঁর সেই আর্থিক
সঙ্গতি কোথায় । শঙ্করেরও নিজের সংসার চালিয়ে জ্যাঠামশাইকে সাহায্য করা একান্তই
সম্ভব ছিল না ।
অবশেষে এক
আশ্চর্যজনক ঘটনা ও যোগাযোগে তাঁর জীবনের মোড় ঘুরে গেল । ফলে এক বছরে অবস্থার
অনেকটা উন্নতি হয়েছে ।
গণেশের বোধহয় একটু তন্দ্রা ভাব এসেছিল । ঠক্ করে একটা আওয়াজে আচ্ছনতা কেটে যেতে দেখলেন
ইজিচেয়ারের হাতলে ধোঁয়াওঠা চায়ের কাপ, ঠিক যেমনটি কমলা জীবিত থাকতে তাঁর বরাদ্দ
ছিল । মাথা তুলে দেখলেন আলপনা হাসিমুখে সামনে দাঁড়িয়ে ।
“মা তোমার জন্য চা পাঠিয়ে দিল । আমি রেডিওটা চালিয়ে
দিয়েছি,” আলপনা এক নিশ্বাসে কথাগুলো আউড়ে যায় ।
গণেশ হাত বাড়িয়ে প্লেটসুদ্ধু কাপটা তুলে নেন । নির্মলা দুটো
বিস্কুটও দিয়ে দিয়েছে প্লেটের ওপর । ঘরের ভিতর থেকে ভেসে এল বীরেন্দ্রকৃষ্ণের
উদাত্ত গলার পাঠ ।
“মা, তুই আজ থাকবি আমার কাছে? আয়, দুজনে মিলে শুনি
অনুষ্ঠানটা ।”
“আমার কি এখন বসার সময় আছে, মা বলেছে চা-জলখাবারের ব্যবস্থা
করতে হাত লাগাতে হবে । আমি মাকে একটু কাজ গুছিয়ে দিয়ে আসবখন ।”
“বেশী দেরী করিস না যেন, ” গণেশ স্মিত হাসি হেসে ঘাড় নাড়েন
।
আলপনা চলে যেতে, গণেশ বিস্কুটে কয়েকটা কামড় দিয়ে গরম চায়ে
চুমুক দেন । মহিষাসুরমর্দিনী আজ কত বছর ধরে শুনছেন, তাও যেন পুরনো হয় না । যতবার
শোনেন মনে হয় নতুন কিছু যেন খুঁজে পেলেন । “জাগো তুমি জাগো” সব থেকে প্রিয় –
প্রতিবছর চক্ষুদান করে প্রতিমার সামনে দাঁড়িয়ে গানটা করেন নিজের মনে । গতবছরই তার একমাত্র
ব্যতিক্রম ঘটেছিল ।
গতবছর তাঁর চোখের এতটাই খারাপ অবস্থা হয়েছিল যে তুলি হাতে তুলে
নিতে ভয় করত । এমনকি চালচিত্র গড়া বা প্রতিমাকে বস্ত্রধারণ করানোর মত কাজেও তিনি সাহস
করে এগোতে পারতেন না । অগত্যা আলপনাকে সহকারী করতে হয়েছিল । তখনই বুঝে গিয়েছিলেন পারিবারিক
ঐতিহ্য বহন করার ক্ষমতা একমাত্র এই মেয়েটার মধ্যে রয়েছে । গণেশ একটা
টুলে বসে আলপনাকে নির্দেশ দিতেন আর আলপনা সেইমত তুলির টান
দিত । তুলির টানে প্রতিমার মুখ প্রসন্ন আর অসুরের চোখ ভয়ার্ত হয়ে উঠত । অভিজ্ঞ কারিগরেরা এসে আলপনার হাতের কাজের প্রশংসা করে যেত, “দা
মশাইয়ের নাতনীটি হয়েছে বেশ ।”
মুশকিল হয়েছিল চক্ষুদান করতে গিয়ে । বায়নার
লোকেরা গণেশের তুলির টান দেখতে প্রতিবছর আসে, আর চক্ষুদানের পরই
পাওনা টাকার একটা বড় কিস্তি দিয়ে থাকে । আলপনার
সাহায্য নিয়ে প্রতিমার সামনে দাঁড়িয়েছিলেন, কিন্তু মুখটা
সঠিক নজরে আসছিলনা । দৃঢ় হাতে তুলি ধরেও গণেশ থেমে গিয়েছিলেন । আলপনা বড়দামশায়ের ইতস্তভাব দেখে ভরসার
হাত এগিয়ে দিয়েছিল । গণেশের তুলিধরা ডানহাতটা নিজের হাতে নিয়ে
প্রতিমার চোখের কোটরে স্পর্শ করিয়েছিল । বাঁহাতটাকে কোটরের অন্যদিকে
ঠেকিয়েছিল, যাতে করে তুলির টান কতদূর যেতে পারে তার একটা আন্দাজ
করতে পারেন । “বড়দামশাই এবারে তুমি টান দাও”, আত্মবিশ্বাসের সুরে
আলপনা বলেছিল । কিন্তু আরম্ভ করেও গণেশ
থেমে গিয়েছিলেন ।
“না মা, মনে হয় না আমার আর এগোন ঠিক হবে । আমি তুলি ছুঁইয়ে দিয়েছি,
বাকিটা তুই আর তোর বাবা মিলে শেষ করে দে । আমি বাবুদের বলে দিচ্ছি এবারের মতো আমাকে
ক্ষমা করে দিতে । এতদিন আমি তুলি ধরে আসছি, এবছরটা আমাকে ছুটি দেওয়া হোক । আগামী বছর
না হয় আবার আমি তুলি ধরব ।”
গণেশের কথামত কাজ হয়েছিল – আলপনাই বেশীটা তুলি ধরে, শঙ্কর
মেয়েকে সাহায্য করে । পার্টিরা বকেয়া টাকা গণেশের হাতে তুলে দিয়ে প্রতিমা ডেলিভারী নেওয়ার ব্যবস্থা করে তবে বিদায় নিয়েছিল
। সে রাতে আলপনা পূজো অনুষ্ঠানের মহলায় বেরিয়ে গেলে শঙ্কর বলেছিল, “দ্যাখো বড়, আমার মনে হয়না তুমি এই অবস্থায় আর বেশীদিন টানতে পারবে
। আমার তো চিন্তা – রাস্তাঘাটে না কোনদিন একটা বিপদ ঘটিয়ে বস । আমি কিন্তু পূজোর পর
থেকেই ডাক্তারের খোঁজ করতে শুরু করে দেব ।”
আলপনার গানের দিকে ঝোঁক আছে বলে ‘সোনাগাছি গণিকা সমিতি’র পূজোতে
ডাক পড়েছিল । ওই পূজোয় সাংস্কৃতিক
অনুষ্ঠানের ভার যার দায়িত্বে ছিল, সেই দুর্গার খুব পছন্দ আলপনাকে । ওর হাতের কাজ
দেখে দুর্গা প্রস্তাব দেয় যে সমিতির আগামী পূজোর প্রতিমা আলপনাই গড়বে । গণেশের
সঙ্গেও দুর্গার ভারী খাতির হয় । গণেশের টুলোতে মূর্তি গড়া দেখতে দুর্গা মাঝেমধ্যে
আসত, ওর সুন্দরবনের গ্রামের কুমোরদের কথা বলত । ফাঁকে ফাঁকে গণেশের সঙ্গে গ্রামের পূজোপ্রস্তুতি
নিয়েও আলোচনা হত । গণেশকে দিয়ে দুর্গা প্রতিশ্রুতি করিয়ে নেয় যে আলপনার কাজের
দেখাশোনা উনিই করবেন । দুর্গাকে নিজের মেয়ের মতই দেখতে শুরু করেছিলেন, তাই মেয়ের
আবদার রাখতে গণেশ রাজী হয়ে গিয়েছিলেন । পরিবর্তে
কাঠামো পূজোর জন্য গণিকা মৃত্তিকা দুর্গাদের উঠোন থেকে আনার অনুমতি পেলেন ।
আলপনার অনুষ্ঠান শুনতে গিয়ে কুমোরটুলি পুরসভার কাউন্সিলরের সঙ্গে পরিচয় হয় । শঙ্করই আলাপ
করিয়ে দেয় । কাউন্সিলর লোকমুখে গণেশের কথা
শুনেছিলেন । কথায় কথায় শঙ্কর তাঁর দৃষ্টিহানির প্রসঙ্গ তুলতেই ভদ্রলোক পূজোর পর তাঁর
অফিসে যেতে বললেন এবং খুব তাড়াতাড়ি বেশ কিছু চক্ষু বিশারদের সঙ্গে গণেশের যোগাযোগ করিয়ে
দিলেন । এনাদের সহায়তায় কর্ণিয়া প্রার্থীর তালিকায় গণেশের নাম যুক্ত হল । ডাক্তারেরা
সতর্ক করে দিলেন – প্রার্থীতালিকা দীর্ঘ, আগামী বছর চারেকের আগে কিছু পাওয়া মুস্কিলের
হবে । তবে হ্যাঁ, কেউ যদি সরাসরি তাঁকে দান করে যান সেটা সৌভাগ্য বলতে হবে ।
পরবর্তী কয়েকটা মাস উৎকন্ঠায় কাটল । কোন চক্ষু প্রতিষ্ঠান
থেকে কেউ যোগাযোগ করল না । গণেশের অবস্থারও কোনরকম হেরফের হল না । ক্ষীণদৃষ্টিতে
অনেকটাই অভস্ত হয়ে আসছিলেন । দেখতে দেখতে কাঠামো পূজোর দিন এসে গেল । এইদিন প্রতিমার
বায়না দিতে পার্টিরা আসবে গণেশের টুলোতে । আলপনাকে দুর্গাদের বাড়ীতে পাঠালেন গণিকা মৃত্তিকার সন্ধানে যা কিনা গঙ্গামাটির
সঙ্গে মিশিয়ে প্রতিমার কাঠামোতে লাগাতে হবে, সঙ্গে শঙ্করও গেল । কিন্তু বাপ-মেয়েকে খালি হাতে ফিরতে দেখে গণেশ আশ্চর্য হলেন ।
শঙ্করের কাছে জানতে পারলেন যে তারা দুর্গাদের বাড়ী অবধি গিয়েছিল,
তারপরে পুলিশ আটকে দেয় । ওই অঞ্চলে হঠাৎ হঠাৎ পুলিশ আসাটা কিছু আশ্চর্যের নয় । তবে
আলপনার কথায় যেটা বুঝলেন সেটা হল দুর্গা তার সই পুতুলকে কোন এক ভয়ঙ্কর রকমের মাতাল খদ্দেরের হাত থেকে বাঁচাতে
গিয়ে নিজে ছুরিকাহত হয়েছে । দুর্গাকে অবিলম্বে হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছে,
তবে তার অবস্থা আশংকাজনক ।
একটু সকাল হতেই আলপনা আর শঙ্করকে নিয়ে গণেশ হাসপাতালের
উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়লেন । নির্মলাকে বলে গেলেন বায়নার পার্টিরা যেন বিকেলে আসে । হাসপাতালে
পৌঁছে দেখেন দুর্গাকে অপারেশন টেবিল থেকে ICUতে দেওয়া হয়েছে । নিয়ে আসার সাথে সাথে ডাক্তাররা ক্ষতের জায়গাটা সেলাই করেছেন
। তবে অনেকটা রক্তক্ষরণের দরুণ মেয়েটা বেহুঁশ, স্যালাইন চলছে । ঘন্টাখানেক অপেক্ষা করার পর গণেশ
বাড়ী ফেরাটাই ঠিক করলেন ।
বিকেলে বায়নার পার্টিদের সঙ্গে পূজোর অর্ডার রফা করে
আলপনাকে নিয়ে গণেশ আবার হাসপাতালে ফিরলেন । তন্দ্রাচ্ছন্ন দুর্গার হাতটা নিজের
হাতে নিয়ে তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন । ক্ষীণদৃষ্টিতে যেন প্রতিমার মুখ দর্শন
করছেন, প্রাণপ্রতিষ্ঠার অপেক্ষায় রয়েছে তাঁর দুর্গা । হৃদয়ের মধ্যে থেকে কে যেন
গেয়ে উঠল “জাগো তুমি জাগো” । মনে হল দুর্গা অস্ফুটস্বরে কিছু একটা বলতে চাইছে । আলপনার
দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালেন । আলপনা ঘাড় নেড়ে বলল “না।”
সেইরাত্রে দুর্গা মারা গেল । পরদিন ভোরে হাসপাতাল থেকে গণেশের
বাড়ীতে খবর গেল, অতিসত্ত্বর যেন গণেশকে এয়ারপোর্টের কাছে চক্ষু হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া
হয় । গণেশ প্রথমটা বিস্মিত হয়েছিলেন – এই যে শুনেছিলেন বেশ কিছু বছর অপেক্ষায়
থাকতে হবে ! পরে জানতে পারলেন যে তাঁর ভাগ্য ফিরেছে দুর্গার দয়ায় । দুর্গা নাকি কিছুদিন
আগে অঙ্গ দানের জন্য নাম নথীভুক্ত করে । সাথীদের
কথাচ্ছলে বলেছিল গণেশ জ্যেঠুর মতন মানুষরা যেন তার চোখ দুটো পান
। জ্যেঠুর মতন একজন শিল্পী দৃষ্টি হারিয়ে ফেলছেন দেখে ও খুব মর্মাহত
হয়েছিল ।
আজ মহিষাসুরমর্দিনী সম্প্রচারের ফাঁকে ফাঁকে গণেশের অনেক কথাই মনে পড়ছিল । শুভ-অশুভের এই যে দ্বন্দ্ব গাঁথা হয়েছে, এতো মানবজীবনেরই প্রতিচ্ছবি । শুভ বিদ্যাবুদ্ধি-ধ্যানধারণার
কাছে অশুভের হার – যুগযুগান্তর ধরে মানবসভ্যতা তো এই প্রচেষ্টায় রত । দুর্গা তাঁকে
অমৃতসমান দৃষ্টিশক্তি দিয়ে গিয়েছে যাতে করে তিনি প্রতিমা দুর্গার প্রাণদান করতে
পারেন ।
“'দা মশাই, প্রোগ্রাম তো শেষ । তুমি কি স্নান করে নেবে, তারপর
জলখাবার খাবে?” আলপনার গলার স্বরে গণেশের হুঁশ ফেরে । ভিতরের ঘরে রেডিওটা তখন যান্ত্রিক শব্দ করে চলেছে । মূহূর্তখানেক
চুপ করে রইলেন গণেশ, তারপর বললেন, “না রে, আজ আমি গঙ্গাস্নান করে সব
কাজ সেরে তারপর খাব । তোর মাকে বল আমার জলখাবারটা যেন তুলে রাখে ।”
নতুন চশমা চোখে ধারণ করে কাঁধে গামছা নিয়ে গণেশ ঘাটের উদ্দেশ্যে
বেরিয়ে পড়লেন । আজ বহুদিন বাদে একটা অদ্ভূত আনন্দ তাঁকে ভরিয়ে তুলেছে । এককালে তো
এই গঙ্গাস্নান করে ঘরেতে কমলার রাখা নতুন ফতুয়া
আর ধুতি পরে চক্ষুদানের তুলি ধরতেন । পরিবর্তিত সময়ে তুলি ধরাটা
একটা প্রয়োজন হয়ে দাঁড়িয়েছিল, তাতে আনন্দের ভাগ তেমন থাকত না ।
স্নান শেষে ঘরে ফিরে গণেশ কোণে রাখা আলমারির সামনে দাঁড়ালেন
। বিয়েতে যৌতুক পাওয়া আলমারির ফাঁকে ফাঁকে কমলার স্মৃতি এখনও রয়ে
গিয়েছে । গণেশ খুঁজে বার করলেন সবুজ ডুরে-কাটা ফতুয়াটা যেটা কমলা জীবিত থাকাকালীন শেষবার
তিনি পরেছিলেন । জামাটা এখনও দিব্যি গায়ে আঁটে । খুঁজেপেতে একটা
পরিষ্কার ধুতিও পেলেন, না হয় এটাও পুরনো ।
“দা মশাই, এই নাও তোমার নতুন ধুতি । মা পাঠিয়ে দিল,” আলপনা
কখন ঘরের চৌকাঠে এসে দাঁড়িয়েছে খেয়াল করেননি । আলপনার হাত থেকে কাপড়টা নিতে গিয়ে
গণেশের দু’চোখ জলে ভরে যায় । অনেকদিন বাদে আনন্দের অশ্রুধারা নামল শীর্ণ গাল বেয়ে
। “যা মা, চট করে স্নানটা করে আয় । আজ তুলি ধরার সময় তোকে তো আমার পাশে থাকতে হবে
।”
আধঘন্টা বাদে আলপনাকে পাশে নিয়ে গণেশ তুলিহাতে প্রতিমার
সামনে দাঁড়ালেন । বায়না পার্টির দু’একজন টুলোর মুখটাতে দাঁড়িয়ে উঁকিঝুকি মারছে । আজ
আর আলপনাকে তাঁর হাত ধরে রাখতে হবে না । আলপনারও বড়দামশাইকে আবার সেই আগের মতো
লাগল – আত্মবিশ্বাসে ভরা শিল্পী যিনি এখনও বয়েসের ভারে নুইয়ে যাননি । প্রতিমার মুখ
গণেশ স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছেন, যেন ত্রিনয়ন দিয়ে অবলোকন করছেন । সেকি তাঁর দুর্গার
মুখ? অভিজ্ঞহাতে তুলির ছোঁয়া লাগালেন সেই মুখে, ক্রমে ক্রমে ফুটে উঠল প্রতিমার চোখ
। একটু দূরে দাঁড়িয়ে নির্মলা মাঙ্গলিক শাঁখে ফুঁ দিলেন । গণেশের অন্তর গেয়ে উঠল, “জাগো
তুমি জাগো —”
প্রিন্সটন, নিউ জার্সি
২৪শে মার্চ, ২০১৯

No comments:
Post a Comment