Friday, March 29, 2019

চক্ষুদান


“বড়দামশাই, চারটে বাজতে চলল তুমি উঠবে না ?”
আলপনার গলা পেয়ে গণেশের ঘুমটা ভেঙ্গে গেল । ছোটভাই কার্তিকের মেজোছেলের চোদ্দ বছরের মেয়ে আলপনা । বড়দামশায়ের সব দেখাশুনোর দায়িত্ব যেন তার । বলাবাহুল্য গণেশ খুবই স্নেহ করেন তাঁর এই নাতনিকে । আর করবেন নাই বা কেন । তাঁর দুই ছেলের পারিবারিক ঐতিহ্য বজায় রাখার কোনরকম উৎসাহ ছিল না । আজ পাঁচ পুরুষ ধরে তাঁদের এই কুমোরটুলিতে আস্তানা । বিয়ের পরে ছেলেরা আলাদা হয়ে গিয়েছে । কার্তিকের পরিবারেও একই অবস্থা, কেবল মেজোছেলে শঙ্কর হাল ধরে রেখেছে । কার্তিক আজ পাঁচ বছর হল গত হয়েছে,ণেশও আট বছর যাবদ বিপত্নীক । ইদানীং স্কুলের পড়ার ফাঁকেফাঁকে আলপনা তার বাবা আর বড়দামশাইকে প্রতিমা গড়ার কাজে সাহায্য করে থাকে ।
আজ মহালয়া । আর বছরের মতো রেডিওতে “মহিষাসুরমর্দিনী” অনুষ্ঠান শুনবেন । স্ত্রী কমলা যখন ছিলেন তখন প্রতিবছর এই সময় দু’কাপ চা বানিয়ে আনতেন, তারপর ধোঁয়াওঠা চা সহযোগে বাকী অনুষ্ঠানটা দুজনে মিলে উপভোগ করতেন । কোন কোন বছর ঘুমিয়ে পড়তেন, কমলার ডাকে যখন ঘুম ভাঙ্গত তখন অনুষ্ঠান প্রায় শেষ, রেডিওতে মাঙ্গলিক শাঁখ বাজছে । তবুও মনটা ভরে থাকত । এখন শঙ্করদের ঘরের টেলিভিশনে শোনেন আরও নানাধরনের অনুষ্ঠান চলছে, অনেক বেলা অবধি ।
আলপনা এসে গণেশকে উঠে বসতে সাহায্য করে, ঘরের কোণের আলনা থেকে ফতুয়াটা এনে দেয় । গণেশ হাত গলিয়ে গায়ে জামাটা টেনে নিয়ে মাথার কাছে টুলের ওপর রাখা মোটা কাঁচের চশমাটা চোখের ওপর ঠিক করে বসিয়ে নেন । অন্ধকারে চোখ ধাতস্ত হতে সময় লাগে । আলপনাই তাঁকে ধরে বাইরের বারান্দায় নিয়ে আসে । বালতিতে রাখা জলে প্লাস্টিকের মগ ডুবিয়ে আচমন করেন, চোখেমুখে জলের ছিটে দিয়ে লুঙ্গির খুঁটের সাহায্যে মুখ মুছে শত তাপ্পিমারা জীর্ণ ইজিচেয়ারটায় গা এলিয়ে দেন ।
“একি বড়দামশাই, তোমার সখের রেডিওটার কাছে গিয়ে বসবে না,” আলপনার গলায় বিস্ময়ের সুর ।
“না মা, আজ আমি দূর থেকেই অনুষ্ঠান শুনব,” গণেশ তাকে আশ্বস্ত করেন ।
আলপনা আর দ্বিরুক্তি না করে নিজেদের ঘরের দিকে এগোয় । অন্ধকারে গণেশ তার মিলিয়ে যাওয়া অবয়ব যেন দেখতে পান । গতবছর এই সময় একহাত দূরের জিনিসও দেখতে পারতেন না, ফলে প্রতিমা গড়ার কাজে বেশ ভাঁটা পড়ে । শঙ্কর বেশ কয়েকজন চোখের ডাক্তারের কাছে নিয়ে গিয়েছিল, সকলের এক অভিমত – নতুন কর্ণিয়া বসাতে হবে । কিন্তু তাঁর সেই আর্থিক সঙ্গতি কোথায় । শঙ্করেরও নিজের সংসার চালিয়ে জ্যাঠামশাইকে সাহায্য করা একান্তই সম্ভব ছিল না ।
অবশেষে এক আশ্চর্যজনক ঘটনা ও যোগাযোগে তাঁর জীবনের মোড় ঘুরে গেল । ফলে এক বছরে অবস্থার অনেকটা উন্নতি হয়েছে ।
গণেশের বোধহয় একটু তন্দ্রা ভাব এসেছিল ।  ঠক্‌ করে একটা আওয়াজে আচ্ছনতা কেটে যেতে দেখলেন ইজিচেয়ারের হাতলে ধোঁয়াওঠা চায়ের কাপ, ঠিক যেমনটি কমলা জীবিত থাকতে তাঁর বরাদ্দ ছিল । মাথা তুলে দেখলেন আলপনা হাসিমুখে সামনে দাঁড়িয়ে ।
“মা তোমার জন্য চা পাঠিয়ে দিল । আমি রেডিওটা চালিয়ে দিয়েছি,” আলপনা এক নিশ্বাসে কথাগুলো আউড়ে যায় ।
গণেশ হাত বাড়িয়ে প্লেটসুদ্ধু কাপটা তুলে নেন । নির্মলা দুটো বিস্কুটও দিয়ে দিয়েছে প্লেটের ওপর । ঘরের ভিতর থেকে ভেসে এল বীরেন্দ্রকৃষ্ণের উদাত্ত গলার পাঠ ।
“মা, তুই আজ থাকবি আমার কাছে? আয়, দুজনে মিলে শুনি অনুষ্ঠানটা ।”
“আমার কি এখন বসার সময় আছে, মা বলেছে চা-জলখাবারের ব্যবস্থা করতে হাত লাগাতে হবে । আমি মাকে একটু কাজ গুছিয়ে দিয়ে আসবখন ।”
“বেশী দেরী করিস না যেন, ” গণেশ স্মিত হাসি হেসে ঘাড় নাড়েন ।
আলপনা চলে যেতে, গণেশ বিস্কুটে কয়েকটা কামড় দিয়ে গরম চায়ে চুমুক দেন । মহিষাসুরমর্দিনী আজ কত বছর ধরে শুনছেন, তাও যেন পুরনো হয় না । যতবার শোনেন মনে হয় নতুন কিছু যেন খুঁজে পেলেন । “জাগো তুমি জাগো” সব থেকে প্রিয় – প্রতিবছর চক্ষুদান করে প্রতিমার সামনে দাঁড়িয়ে গানটা করেন নিজের মনে । গতবছরই তার একমাত্র ব্যতিক্রম ঘটেছিল ।
গতবছর তাঁর চোখের এতটাই খারাপ অবস্থা হয়েছিল যে তুলি হাতে তুলে নিতে ভয় করত । এমনকি চালচিত্র গড়া বা প্রতিমাকে বস্ত্রধারণ করানোর মত কাজেও তিনি সাহস করে এগোতে পারতেন না । অগত্যা আলপনাকে সহকারী করতে হয়েছিল । তখনই বুঝে গিয়েছিলেন পারিবারিক ঐতিহ্য বহন করার ক্ষমতা একমাত্র এই মেয়েটার মধ্যে রয়েছে । গণেশ একটা টুলে বসে আলপনাকে নির্দেশ দিতেন আর আলপনা সেইমত তুলির টান দিত । তুলির টানে প্রতিমার মুখ প্রসন্ন আর অসুরের চোখ ভয়ার্ত হয়ে উঠত । অভিজ্ঞ কারিগরেরা এসে আলপনার হাতের কাজের প্রশংসা করে যেত, “দা মশাইয়ের নাতনীটি হয়েছে বেশ ।”
মুশকিল হয়েছিল চক্ষুদান করতে গিয়ে । বায়নার লোকেরা গণেশের তুলির টান দেখতে প্রতিবছর আসে, আর চক্ষুদানের পরই পাওনা টাকার একটা বড় কিস্তি দিয়ে থাকে । আলপনার সাহায্য নিয়ে প্রতিমার সামনে দাঁড়িয়েছিলেন, কিন্তু মুখটা সঠিক নজরে আসছিলনা । দৃঢ় হাতে তুলি ধরেও গণেশ থেমে গিয়েছিলেন আলপনা বড়দামশায়ের ইতস্তভাব দেখে ভরসার হাত এগিয়ে দিয়েছিল । গণেশের তুলিধরা ডানহাতটা নিজের হাতে নিয়ে প্রতিমার চোখের কোটরে স্পর্শ করিয়েছিল । বাঁহাতটাকে কোটরের অন্যদিকে ঠেকিয়েছিল, যাতে করে তুলির টান কতদূর যেতে পারে তার একটা আন্দাজ করতে পারেন । “বড়দামশাই এবারে তুমি টান দাও, আত্মবিশ্বাসের সুরে আলপনা বলেছিল কিন্তু আরম্ভ করেও গণেশ থেমে গিয়েছিলেন
“না মা, মনে হয় না আমার আর এগোন ঠিক হবে । আমি তুলি ছুঁইয়ে দিয়েছি, বাকিটা তুই আর তোর বাবা মিলে শেষ করে দে । আমি বাবুদের বলে দিচ্ছি এবারের মতো আমাকে ক্ষমা করে দিতে । এতদিন আমি তুলি ধরে আসছি, এবছরটা আমাকে ছুটি দেওয়া হোক । আগামী বছর না হয় আবার আমি তুলি ধরব ।
গণেশের কথামত কাজ হয়েছিল – আলপনাই বেশীটা তুলি ধরে, শঙ্কর মেয়েকে সাহায্য করে । পার্টিরা বকেয়া টাকা গণেশের হাতে তুলে দিয়ে প্রতিমা ডেলিভারী নেওয়ার ব্যবস্থা করে তবে বিদায় নিয়েছিল । সে রাতে আলপনা পূজো অনুষ্ঠানের মহলায় বেরিয়ে গেলে শঙ্কর বলেছিল, “দ্যাখো বড়, আমার মনে হয়না তুমি এই অবস্থায় আর বেশীদিন টানতে পারবে । আমার তো চিন্তা – রাস্তাঘাটে না কোনদিন একটা বিপদ ঘটিয়ে বস । আমি কিন্তু পূজোর পর থেকেই ডাক্তারের খোঁজ করতে শুরু করে দেব ।
আলপনার গানের দিকে ঝোঁক আছে বলে ‘সোনাগাছি গণিকা সমিতি’র পূজোতে ডাক পড়েছিল ।  ওই পূজোয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের ভার যার দায়িত্বে ছিল, সেই দুর্গার খুব পছন্দ আলপনাকে । ওর হাতের কাজ দেখে দুর্গা প্রস্তাব দেয় যে সমিতির আগামী পূজোর প্রতিমা আলপনাই গড়বে । গণেশের সঙ্গেও দুর্গার ভারী খাতির হয় । গণেশের টুলোতে মূর্তি গড়া দেখতে দুর্গা মাঝেমধ্যে আসত, ওর সুন্দরবনের গ্রামের কুমোরদের কথা বলত ।  ফাঁকে ফাঁকে গণেশের সঙ্গে গ্রামের পূজোপ্রস্তুতি নিয়েও আলোচনা হত । গণেশকে দিয়ে দুর্গা প্রতিশ্রুতি করিয়ে নেয় যে আলপনার কাজের দেখাশোনা উনিই করবেন । দুর্গাকে নিজের মেয়ের মতই দেখতে শুরু করেছিলেন, তাই মেয়ের আবদার রাখতে গণেশ রাজী হয়ে গিয়েছিলেন । পরিবর্তে কাঠামো পূজোর জন্য গণিকা মৃত্তিকা দুর্গাদের উঠোন থেকে আনার অনুমতি পেলেন ।
আলপনার অনুষ্ঠান শুনতে গিয়ে কুমোরটুলি পুরসভার কাউন্সিলরের সঙ্গে পরিচয় হয় । শঙ্করই আলাপ করিয়ে দেয় ।  কাউন্সিলর লোকমুখে গণেশের কথা শুনেছিলেন । কথায় কথায় শঙ্কর তাঁর দৃষ্টিহানির প্রসঙ্গ তুলতেই ভদ্রলোক পূজোর পর তাঁর অফিসে যেতে বললেন এবং খুব তাড়াতাড়ি বেশ কিছু চক্ষু বিশারদের সঙ্গে গণেশের যোগাযোগ করিয়ে দিলেন । এনাদের সহায়তায় কর্ণিয়া প্রার্থীর তালিকায় গণেশের নাম যুক্ত হল । ডাক্তারেরা সতর্ক করে দিলেন – প্রার্থীতালিকা দীর্ঘ, আগামী বছর চারেকের আগে কিছু পাওয়া মুস্কিলের হবে । তবে হ্যাঁ, কেউ যদি সরাসরি তাঁকে দান করে যান সেটা সৌভাগ্য বলতে হবে ।
পরবর্তী কয়েকটা মাস উৎকন্ঠায় কাটল । কোন চক্ষু প্রতিষ্ঠান থেকে কেউ যোগাযোগ করল না । গণেশের অবস্থারও কোনরকম হেরফের হল না । ক্ষীণদৃষ্টিতে অনেকটাই অভস্ত হয়ে আসছিলেন । দেখতে দেখতে কাঠামো পূজোর দিন এসে গেল । এইদিন প্রতিমার বায়না দিতে পার্টিরা আসবে গণেশের টুলোতে । আলপনাকে দুর্গাদের বাড়ীতে পাঠালেন গণিকা মৃত্তিকার সন্ধানে যা কিনা গঙ্গামাটির সঙ্গে মিশিয়ে প্রতিমার কাঠামোতে লাগাতে হবে, সঙ্গে শঙ্করও গেল । কিন্তু বাপ-মেয়েকে খালি হাতে ফিরতে দেখে গণেশ আশ্চর্য হলেন ।
শঙ্করের কাছে জানতে পারলেন যে তারা দুর্গাদের বাড়ী অবধি গিয়েছিল, তারপরে পুলিশ আটকে দেয় । ওই অঞ্চলে হঠাৎ হঠাৎ পুলিশ আসাটা কিছু আশ্চর্যের নয় । তবে আলপনার কথায় যেটা বুঝলেন সেটা হল দুর্গা তার সই পুতুলকে কোন এক ভয়ঙ্কর রকমের মাতাল খদ্দেরের হাত থেকে বাঁচাতে গিয়ে নিজে ছুরিকাহত হয়েছে । দুর্গাকে অবিলম্বে হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছে, তবে তার অবস্থা আশংকাজনক ।
একটু সকাল হতেই আলপনা আর শঙ্করকে নিয়ে গণেশ হাসপাতালের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়লেন । নির্মলাকে বলে গেলেন বায়নার পার্টিরা যেন বিকেলে আসে । হাসপাতালে পৌঁছে দেখেন দুর্গাকে অপারেশন টেবিল থেকে ICUতে দেওয়া হয়েছে । নিয়ে আসার সাথে সাথে ডাক্তাররা ক্ষতের জায়গাটা সেলাই করেছেন । তবে অনেকটা রক্তক্ষরণের দরুণ মেয়েটা বেহুঁশ,  স্যালাইন চলছে । ঘন্টাখানেক অপেক্ষা করার পর গণেশ বাড়ী ফেরাটাই ঠিক করলেন ।
বিকেলে বায়নার পার্টিদের সঙ্গে পূজোর অর্ডার রফা করে আলপনাকে নিয়ে গণেশ আবার হাসপাতালে ফিরলেন । তন্দ্রাচ্ছন্ন দুর্গার হাতটা নিজের হাতে নিয়ে তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন । ক্ষীণদৃষ্টিতে যেন প্রতিমার মুখ দর্শন করছেন, প্রাণপ্রতিষ্ঠার অপেক্ষায় রয়েছে তাঁর দুর্গা । হৃদয়ের মধ্যে থেকে কে যেন গেয়ে উঠল “জাগো তুমি জাগো” । মনে হল দুর্গা অস্ফুটস্বরে কিছু একটা বলতে চাইছে । আলপনার দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালেন । আলপনা ঘাড় নেড়ে বলল “না।”
সেইরাত্রে দুর্গা মারা গেল । পরদিন ভোরে হাসপাতাল থেকে গণেশের বাড়ীতে খবর গেল, অতিসত্ত্বর যেন গণেশকে এয়ারপোর্টের কাছে চক্ষু হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় । গণেশ প্রথমটা বিস্মিত হয়েছিলেন – এই যে শুনেছিলেন বেশ কিছু বছর অপেক্ষায় থাকতে হবে ! পরে জানতে পারলেন যে তাঁর ভাগ্য ফিরেছে দুর্গার দয়ায় । দুর্গা নাকি কিছুদিন আগে অঙ্গ দানের জন্য নাম নথীভুক্ত করে । সাথীদের কথাচ্ছলে বলেছিল গণেশ জ্যেঠুর মতন মানুষরা যেন তার চোখ দুটো পান । জ্যেঠুর মতন একজন শিল্পী দৃষ্টি হারিয়ে ফেলছেন দেখে ও খুব মর্মাহত হয়েছিল ।
আজ মহিষাসুরমর্দিনী সম্প্রচারের ফাঁকে ফাঁকে গণেশের অনেক কথাই মনে পড়ছিল । শুভ-অশুভের এই যে দ্বন্দ্ব গাঁথা হয়েছে, এতো মানবজীবনেরই প্রতিচ্ছবি । শুভ বিদ্যাবুদ্ধি-ধ্যানধারণার কাছে অশুভের হার – যুগযুগান্তর ধরে মানবসভ্যতা তো এই প্রচেষ্টায় রত । দুর্গা তাঁকে অমৃতসমান দৃষ্টিশক্তি দিয়ে গিয়েছে যাতে করে তিনি প্রতিমা দুর্গার প্রাণদান করতে পারেন ।
“'দা মশাই, প্রোগ্রাম তো শেষ । তুমি কি স্নান করে নেবে, তারপর জলখাবার খাবে?” আলপনার গলার স্বরে গণেশের হুঁশ ফেরে । ভিতরের ঘরে রেডিওটা তখন যান্ত্রিক শব্দ করে চলেছে । মূহূর্তখানেক চুপ করে রইলেন গণেশ, তারপর বললেন, “না রে, আজ আমি গঙ্গাস্নান করে সব কাজ সেরে তারপর খাব । তোর মাকে বল আমার জলখাবারটা যেন তুলে রাখে ।”
নতুন চশমা চোখে ধারণ করে কাঁধে গামছা নিয়ে গণেশ ঘাটের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়লেন । আজ বহুদিন বাদে একটা অদ্ভূত আনন্দ তাঁকে ভরিয়ে তুলেছে । এককালে তো এই গঙ্গাস্নান করে ঘরেতে কমলার রাখা নতুন ফতুয়া আর ধুতি পরে চক্ষুদানের তুলি ধরতেন । পরিবর্তিত সময়ে তুলি ধরাটা একটা প্রয়োজন হয়ে দাঁড়িয়েছিল, তাতে আনন্দের ভাগ তেমন থাকত না ।
স্নান শেষে ঘরে ফিরে গণেশ কোণে রাখা আলমারির সামনে দাঁড়ালেন । বিয়েতে যৌতুক পাওয়া আলমারির ফাঁকে ফাঁকে কমলার স্মৃতি এখনও রয়ে গিয়েছে । গণেশ খুঁজে বার করলেন সবুজ ডুরে-কাটা ফতুয়াটা যেটা কমলা জীবিত থাকাকালীন শেষবার তিনি পরেছিলেন । জামাটা এখনও দিব্যি গায়ে আঁটে । খুঁজেপেতে একটা পরিষ্কার ধুতিও পেলেন, না হয় এটাও পুরনো ।
“দা মশাই, এই নাও তোমার নতুন ধুতি । মা পাঠিয়ে দিল,” আলপনা কখন ঘরের চৌকাঠে এসে দাঁড়িয়েছে খেয়াল করেননি । আলপনার হাত থেকে কাপড়টা নিতে গিয়ে গণেশের দু’চোখ জলে ভরে যায় । অনেকদিন বাদে আনন্দের অশ্রুধারা নামল শীর্ণ গাল বেয়ে । “যা মা, চট করে স্নানটা করে আয় । আজ তুলি ধরার সময় তোকে তো আমার পাশে থাকতে হবে ।”
আধঘন্টা বাদে আলপনাকে পাশে নিয়ে গণেশ তুলিহাতে প্রতিমার সামনে দাঁড়ালেন । বায়না পার্টির দু’একজন টুলোর মুখটাতে দাঁড়িয়ে উঁকিঝুকি মারছে । আজ আর আলপনাকে তাঁর হাত ধরে রাখতে হবে না । আলপনারও বড়দামশাইকে আবার সেই আগের মতো লাগল – আত্মবিশ্বাসে ভরা শিল্পী যিনি এখনও বয়েসের ভারে নুইয়ে যাননি । প্রতিমার মুখ গণেশ স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছেন, যেন ত্রিনয়ন দিয়ে অবলোকন করছেন । সেকি তাঁর দুর্গার মুখ? অভিজ্ঞহাতে তুলির ছোঁয়া লাগালেন সেই মুখে, ক্রমে ক্রমে ফুটে উঠল প্রতিমার চোখ । একটু দূরে দাঁড়িয়ে নির্মলা মাঙ্গলিক শাঁখে ফুঁ দিলেন । গণেশের অন্তর গেয়ে উঠল, “জাগো তুমি জাগো —”

প্রিন্সটন, নিউ জার্সি
২৪শে মার্চ, ২০১৯

No comments:

Post a Comment

আলোয় ফেরা

প্রতি বছর সময়ের কাঁটা মিলিয়ে এই বৈশাখ মাসে আমার নিউ জার্সির ঘর-গেরস্থালির আশপাশ ঘিরে প্রকৃতি অপরূপ সাজে সেজে ওঠে । কোথায় “দারুণ অগ্নিবা ...